সোনারগাঁয়ে পাঁচ দিনব্যাপী বউ মেলা

ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এদেশের মানুষের জন্য বিনোদনের সহায়ক মাধ্যম হিসেবে প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে গ্রামীন ঐতিহ্যর বিভিন্ন মেলা। তৎকালীন সময়ে বিনোদনের জন্য আধুনিক সুযোগ সুবিধা না থাকায় গ্রামীন ঐতিহ্য মেলা ও বিভিন্ন ধরনের আয়োজনই ছিল বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম।
জমিদারী প্রথা চলাকালীন সময়ে সম্রাট আকবরের শাসনামল থেকে বাংলা সনের পহেলা বৈশাখে খাজনা আদায়ের প্রাক্কলন থেকেই মূলত মেলা বা বিভিন্ন উৎসবের শুরু। এরই ধারাবাহিকতায় নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদ সন্নিকটে জয়রামপুর এলাকায় দুইশত বছরের পুরোনো একটি বট গাছের নিচে প্রতি বছরের মত এবারও পাঁচ দিনব্যাপী বউ মেলা শুরু হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে জয়রামপুর এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের আদিঐতিহ্যে ধারন করা দুইশত বছরের পুরোনো বট গাছের নিচে প্রতিবছরের মত এবারও বউ মেলা বসেছে। মেলায় আগত স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জয়রামপুর এলাকায় দুইশত বছরের প্রাচীন একটি বট গাছের নিচে এ মেলায় অংশ গ্রহনকারীদের অধিকাংশই হচ্ছে নারী।
প্রাচীন এ বৃক্ষটি সিদ্ধেশ্বরী কালীতলা নামে পরিচিত। কিন্তু এলাকায় এটাকে বলা হয় বউতলা। অগনিত রমণীর কলহাস্য ও পদচারণায় মুখরিত এই মেলার নাম বউ মেলা। মেলায় পুরুষদের অংশ গ্রহন থাকলেও তবে সংখ্যায় নেহাতই কম। প্রতি বছর এই সিদ্ধেশ্বরী কালীতলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন বউ মেলার সঙ্গে পূজার আয়োজন করে।
হিন্দু রমণীকুল হাতের রিকাবীতে তরমুজ, কাঁঠাল, কলা, আম, শশা, বাঙ্গি ও বিভিন্ন রকমের মৌসুমী ফল নিয়ে লাইন ধরে বটবৃক্ষ তলে ভোগ দেন। মৌসুমী ফলের স্তুপ পড়ে যায় বটগাছ তলায়। স্তুপীকৃত ফল পূজা-অর্চনা শেষে ভক্তদের মাঝে প্রসাদরূপে বিতরণ করা হয়। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের ভাষ্যমতে, জয়রামপুর এলাকার এই বটবৃক্ষটি ‘সিদ্ধেশ্বরী দেবী’ হিসেবে পূজিত হয়ে আসছে প্রায় দুইশত বছর ধরে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের বিশ্বাস এই বটতলায় পূজা দিলে স্বামী সংসারের বাঁধন আমৃত্যু অটুট থাকে, সংসারে সুখ-শান্তি আসে, স্বামী-সন্তানসহ পরিবারের সবার মঙ্গল হয়। এই কামনাতেই মূলত পূজার আয়োজন। হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীরা তাই সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন এই দিনের জন্য। পূজার পরপরই শুরু হয় ৫ দিনব্যাপী বউমেলার। অনেকেই আবার মানত পূরণের অংশ হিসেবে মেলা প্রাঙ্গনে বটবৃক্ষের পাশে কবুতর উড়ায় ও পাঁঠা বলিও দিয়ে থাকেন।
বউ মেলায় আসা উপজেলার বৈদ্যেরবাজার এলাকার বাসিন্দা কমলা রানী ও সুনীল দাস জানায়, স্বামী স্ত্রীর পুরোনো বছরের বিবাদ দুরে ঠেলে একজন বধু যেন তার স্বামীর সংসারে ধনধান্যে ভরিয়ে তুলতে পারে সে জন্য নারীরা এ মেলায় আসে।
মেলা পরিচালনা কমিটির একজন সদস্য জানান, যেকোন মেলা বা উৎসবেই পুরুষদের উপস্থিতি থাকে বেশী। সে কারনে মহিলাদের মেলায় যাওয়ার তেমন একটা সুযোগ থাকেনা। একথা বিবেচনা করেই জমিদার শ্যামাচরন ভট্টপুর জয়রামপুর এলাকার এমেলাটিকে বৌ মেলা হিসেবে নাম করন করেছিলেন। সেই থেকেই এ মেলাটি বৌ মেলা হিসেবে পরিচিত।
মেলায় বৌদের পাশাপাশি তাদের স্বামী সন্তানরাও অংশ গ্রহন করে থাকে তবে সংখ্যায় খুবই কম। পাঁচ দিনব্যাপী মেলা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা কালি পুজার আয়োজন করে থাকে।
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ আল জিনাত জানান, সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী এই বউ মেলাকে ঘিরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতির অনন্য সংমিশ্রণে সোনারগাঁয়ের এই বউমেলা শুধু একটি আয়োজন নয়।
এটি হয়ে উঠেছে গ্রামীণ জীবনের প্রাণের উৎসব, যা যুগের পর যুগ ধরে বাঙালির সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। নারী-কেন্দ্রিক এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ভোরের আকাশ/ র.ই