পেকুয়ায় বন উজাড়ের মহোৎসব: হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ পাহাড়

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে চলছে পরিবেশ ধ্বংসের নীরব মহোৎসব। পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ, অবৈধ বালু উত্তোলন, নির্বিচারে বনজ গাছ কেটে টমটম, ট্রলি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও পিকআপে কাঠ পাচারসহ সব মিলিয়ে দ্রুত বদলে যাচ্ছে টৈটংয়ের পাহাড়ি জনপদ। একসময়ের ঘন সবুজে আচ্ছাদিত পাহাড় এখন কাটা গাছের গোড়া, ক্ষতবিক্ষত ঢাল আর অবৈধ সড়কের দখলে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। অভিযোগের তীর বন বিভাগের স্থানীয় একাংশের দিকেও।
সম্প্রতি সরেজমিনে টৈটং ইউনিয়নের গলাছিরা তিন মোয়া, কেরুণছড়ি ও হাসানের জুম এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে সদ্য কেটে ফেলা বড় বড় বনজ গাছের গোড়া পড়ে রয়েছে। কোথাও গাছ সরিয়ে নেওয়া হলেও রয়ে গেছে কেবল গোড়ার অংশ। পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি করা হয়েছে প্রায় ৩০০ মিটার দীর্ঘ একটি কাঁচা সড়ক। সড়কের দুই পাশে কাটা পাহাড়ের ঢাল স্পষ্ট। বনাঞ্চলের ভেতরে বালু উত্তোলনের প্রস্তুতিরও নানা আলামত দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, এই সড়ক ব্যবহার করেই পাহাড় থেকে বালু উত্তোলন এবং মূল্যবান বনজ গাছ পাচার করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিনই টমটম, ট্রলি, সিএনজি ও পিকআপে করে পাহাড় থেকে কেটে আনা কাঠ বিভিন্ন এলাকায় পাচার করা হচ্ছে। দিনের পাশাপাশি রাতের আঁধারেও চলে কাঠ পরিবহন। কার্যকর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযানের অভাবে পাচারকারীরা প্রায় বাধাহীনভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি কেরুণছড়ি এলাকা থেকে অবৈধভাবে কাটা বনজ গাছবোঝাই একটি ট্রলি হাসানের জুম ব্রিজ এলাকায় আটক করেন বন পাহারাদার সর্দার ফিরোজ। তিনি বিষয়টি টৈটং বিট কর্মকর্তা মোতালেব আল মোমিনকে জানান।
প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, বিট কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে এসে ট্রলিটি বিট অফিসে নেওয়ার কথা বললেও পরে সেটি জব্দ না করে ছেড়ে দেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ কাঠ পাচার চক্র দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত বন থেকে মূল্যবান গাছ কেটে বিভিন্ন এলাকায় সরিয়ে নিচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, হাসানের জুম এলাকার মনু ও কালুসহ কয়েকজন এ কাজে সক্রিয়। পাশাপাশি গলাছিরা তিন মোয়া এলাকায় আনিসুর রহমান সওদাগর, আব্দু রহিমসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণের আড়ালে বালু উত্তোলন ও বন ধ্বংসের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়ায় কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পান না।
আরও অভিযোগ রয়েছে, টৈটং এলাকার অলী আহমদ ও কাশেম নামে দুই ব্যক্তি বিট কর্মকর্তার অনানুষ্ঠানিক সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। তাদের মাধ্যমে বনভূমিতে নতুন বসতি স্থাপন, বনজ গাছ কাটা, পাহাড় কাটা ও বালু উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ড থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি টমটমে বহন করা কাঠের জন্য ২০০ টাকা এবং প্রতিটি ট্রলির জন্য ৪০০ টাকা করে মাসোহারা নেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় টৈটংয়ের পাহাড়জুড়ে সেগুন, গর্জন, চাপালিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান বনজ গাছের ঘন বন ছিল। এখন অধিকাংশ পাহাড়ে কেবল কাটা গাছের গোড়া দেখা যায়। কোথাও কোথাও গাছ কাটার আলামত মুছে ফেলতে গোড়া উপড়ে ফেলা কিংবা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সংরক্ষিত বনভূমিতে নতুন বসতি স্থাপন, পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ এবং অবৈধ স্থাপনা তৈরির ঘটনাও বেড়েছে।
বন পাহারাদার সর্দার ফিরোজ বলেন, আমি একটি গাছবোঝাই ট্রলি আটক করে বিট কর্মকর্তাকে খবর দিই। তিনি এসে ট্রলিটি বিট অফিসে নেওয়ার কথা বলে নিয়ে যান। পরে জানতে পারি সেটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বন বিভাগের লোকজনই যদি পাচারকারীদের সহযোগিতা করেন, তাহলে বন রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বন বিভাগের একটি সূত্র জানায়, লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) দেলোয়ার হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান বলেন, তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সরেজমিনে পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণের প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে টৈটং বিট কর্মকর্তা মোতালেব আল মোমিন তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি কোনো গাড়ি আটক করিনি। তাই ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণের বিষয়টিও আমার জানা নেই। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের সহকারী বনসংরক্ষক (এসিএফ) দেলোয়ার হোসেনের কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, টৈটং বিটকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। তদন্তে কোনো বন কর্মকর্তা, কর্মচারী বা অন্য কারও সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় বিধি ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভোরের আকাশ/এনউব