মহাদেবপুরে সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত ৫

ভোর তখনও ভালো করে ফোটেনি। কুয়াশা ঢাকা মহাদেবপুর–-পত্মীতলা সড়ক ধরে ধীরে এগোচ্ছিল একটি ব্যাটারিচালিত ভ্যান। ভ্যানে বসে থাকা পাঁচজন মানুষ কথা বলছিলেন দিনের বাজারদর আর সংসারের হিসাব নিয়ে। নিজেদের জমিতে ফলানো হলুদ বিক্রি করতেই মহাদেবপুর হাটের পথে বেরিয়ে ছিলেন তারা। কিন্তু সেই ভোরই তাদের জীবনের শেষ ভোর হয়ে উঠল।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে শিবপুর পাটকাঠি এলাকায় দ্রুতগতির একটি ডাম্পট্রাক ভ্যানটিকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই চারজনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান আরেকজন। নিহত পাঁচজনই ছিলেন আদিবাসী কৃষক। নিহতরা হলেন বীরেন পাহান (৩৫), উজ্জল পাহান (৩৮), বিপুল পাহান (২৫), সঞ্জু উড়াও (৪৫) ও বিপ্লব পাহান (২২)। তারা সবাই এনায়েতপুর ইউনিয়নের নূরপুর গ্রামের বাসিন্দা।
নূরপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, একের পর এক উঠোনে কান্নার শব্দ। যেসব মানুষ প্রতিদিন ভোরে মাঠে যেতেন, আজ তাদের উঠোন ফাঁকা। বীরেন পাহানের বাড়িতে বসে তার স্ত্রী শুধু বলছিলেন, “হলুদ বিক্রি করে ফিরে আসার কথা ছিল। দুপুরে ভাত খাব এই কথা বলে বের হয়েছিল।”
সঞ্জু উড়াওয়ের পরিবার জানায়, তিনিই ছিলেন সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যুতে পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ডাম্পট্রাকটি ছিল অত্যন্ত দ্রুতগতির। সংঘর্ষের পর ভ্যানটি সম্পূর্ণ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে থাকে হলুদের বস্তা যেগুলো বিক্রি হলে কয়েক হাজার টাকা পাওয়া যেত। সেই হলুদই ছিল তাদের পরিবারের সারা মৌসুমের আশা।
মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছানোর পর স্বজনরা একে একে মৃত্যুসংবাদ পান। আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস বলেন, “চারজনকে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছিল। একজনকে রেফার্ড করা হলেও বাঁচানো যায়নি।”
দুর্ঘটনার পর ঘাতক ডাম্পট্রাকটি সড়কের পাশের একটি খালে পাওয়া গেলেও চালক ও হেলপার পালিয়ে গেছে। পুলিশ ট্রাকটি জব্দ করেছে এবং মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। গ্রামের মানুষদের অভিযোগ, ভোরের সময় এই সড়কে ভারী যানবাহন দ্রুতগতিতে চলাচল করলেও নজরদারি নেই। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “এটা শুধু দুর্ঘটনা না, অবহেলা। গরিব মানুষগুলোই বারবার মারা যায়।”
শনিবার মহাদেবপুর হাটে নিহতদের কেউই পৌঁছাতে পারেননি। তাদের হলুদ বিক্রি হয়নি। বাজারের সেই জায়গা ফাঁকা ছিল, আর নূরপুর গ্রামে পড়ে ছিল পাঁচটি নিথর দেহ পাঁচটি পরিবারের স্বপ্নের শেষ ঠিকানা।
ভোরের আকাশ/র.ই