শিরোনাম
বিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রীবিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

পাহাড়ে কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলছে কারিগরি প্রশিক্ষণে

রাঙামাটি (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

প্রকাশ : ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০২ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ছবি- ভোরের আকাশ
ছবি- ভোরের আকাশ

পাহাড়ের দুর্গম জনপদে কাজের আগ্রহ থাকলেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। একই বাস্তবতার মুখোমুখি পাহাড়ের নারীরাও। এমন পরিস্থিতিতে কারিগরি ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণ তাদের সামনে খুলে দিচ্ছে নতুন সম্ভাবনার দরজা।

পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান এবং গুইমারা রিজিয়নের বিভিন্ন সেনা জোনের উদ্যোগে চলমান কর্মমুখী ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন পাহাড়ি ও বাঙালি তরুণ-তরুণীরা। চিকিৎসাসেবা থেকে মোবাইল ফোন মেরামত, কম্পিউটার, ইলেকট্রিশিয়ান, যানবাহন মেরামত, ড্রাইভিং, সেলাই, কৃষি প্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তাদের।

আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে চলমান এসব কর্মসূচির লক্ষ্য শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়। প্রশিক্ষণ শেষে একজন তরুণ বা নারী যেন অর্জিত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয় করতে পারেন, পরিবারে ভূমিকা রাখতে পারেন এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারেন—সেই লক্ষ্যেই আয়োজন করা হয়েছে এসব কর্মসূচি।

খাগড়াছড়ি রিজিয়নে চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও মেকানিক্যাল খাতে প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গত ২ থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত প্রথম ধাপে ২৩ জনকে মিডওয়াইফারি ও নার্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে ২৩ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও ৩৪ জন এই প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

একই সময়ে মোবাইল ফোন মেরামত বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন ১০৮ জন। কম্পিউটার, যন্ত্রপাতি মেরামত ও ইলেকট্রিশিয়ান প্রশিক্ষণেও অংশ নিচ্ছেন আরও ৭৩ জন পাহাড়ি ও বাঙালি তরুণ-তরুণী।

মোবাইল ফোনের ত্রুটি শনাক্ত করা, কম্পিউটারে কাজ শেখা কিংবা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি মেরামতের মতো দক্ষতা বাইরে থেকে ছোট মনে হলেও দুর্গম পাহাড়ি এলাকার একজন তরুণের জন্য এগুলো হতে পারে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রথম সিঁড়ি।

রাঙামাটি রিজিয়নেও একইভাবে কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে মোট ৯৫ জন তরুণ-তরুণীকে বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৫ জন পাহাড়ি তরুণীকে মিডওয়াইফারি ও নার্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আগামী অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে দর্জি কাজ, কম্পিউটার, যানবাহন মেরামত ও মোবাইল ফোন মেরামত বিষয়ে আরও প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

পাহাড়ের নারীদের জন্য এসব প্রশিক্ষণের গুরুত্ব আরও বেশি। দুর্গম এলাকার অনেক নারী পারিবারিক ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে ঘরের বাইরে নিয়মিত কাজের সুযোগ পান না। তাদের জন্য নার্সিং, মিডওয়াইফারি ও সেলাইয়ের মতো প্রশিক্ষণ ঘরে বসে কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বান্দরবান রিজিয়নে সেপ্টেম্বরজুড়ে এসি ও ফ্রিজ মেরামত, সেলাই, যানবাহন চালনা ও কৃষি প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হচ্ছে। অক্টোবর মাসে মোবাইল ফোন মেরামত এবং ডিসেম্বর মাসে তরুণদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণেরও পরিকল্পনা রয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা খাতেও নারীদের দক্ষ করে তুলতে সেখানে দুই ধাপে মিডওয়াইফারি ও নার্সিং প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে ২ থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত ১৯ জন পাহাড়ি নারী প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। পরবর্তী ধাপে আরও ৪০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

গুইমারা রিজিয়নেও স্বাস্থ্যসেবা ও কারিগরি দক্ষতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিন ধাপে মোট ৪৯ জন পাহাড়ি ও বাঙালি তরুণ-তরুণীকে মিডওয়াইফারি ও নার্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মোবাইল ফোন মেরামত ও যানবাহন মেকানিক প্রশিক্ষণেও অংশ নিচ্ছেন আরও ৪০ জন।

এসব প্রশিক্ষণের সবচেয়ে বড় দিক হলো—শুধু সনদ অর্জন নয়, বাস্তব জীবনে কাজে লাগানোর মতো দক্ষতা তৈরি করা। একজন প্রশিক্ষিত মোবাইল টেকনিশিয়ান স্থানীয় বাজারে ছোট একটি দোকান দিতে পারেন। একজন গাড়ির মেকানিক নিজেই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন। একজন প্রশিক্ষিত নারী সেলাইয়ের কাজ করে পরিবারের আয় বাড়াতে পারেন। আবার ফ্রিল্যান্সিং শেখা একজন তরুণ ঘরে বসেই অনলাইনে কাজের সুযোগ খুঁজে নিতে পারেন।

অর্থাৎ, প্রশিক্ষণ এখানে শুধু একটি কোর্স নয়; অনেকের কাছে এটি হয়ে উঠছে জীবিকা পরিবর্তনের সম্ভাব্য হাতিয়ার। শুধু কর্মদক্ষতা নয়, সামাজিক বন্ধন তৈরিতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও ‘সম্প্রীতি কাপ’ ফুটবল টুর্নামেন্টের মাধ্যমে পাহাড়ি ও বাঙালি তরুণদের একই মাঠে নিয়ে আসা হচ্ছে।

একটি ফুটবল ম্যাচে প্রতিপক্ষ দলের জার্সি ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু খেলা শেষে পরিচয় হয়ে উঠতে পারে সতীর্থ কিংবা বন্ধু। এমন আয়োজন তরুণদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও আস্থা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করছে।

পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিভাবান ফুটবলারদের জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে নতুন সুযোগ। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময়ে পার্বত্য অঞ্চলে এসে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের যাচাই-বাছাই করছেন। এতে প্রত্যন্ত এলাকার সম্ভাবনাময় তরুণদের জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরার পথ তৈরি হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হলে অবকাঠামো, যোগাযোগ কিংবা পর্যটনের মতো বড় বিষয়গুলো সামনে আসে। তবে উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ মানুষ। চলমান প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলো সেই বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

একজন তরুণ যখন কাজ শেখেন, তখন তার হাতে শুধু একটি পেশা আসে না; বাড়ে আত্মবিশ্বাসও। একজন নারী যখন নিজের দক্ষতায় আয় করার সুযোগ পান, তখন তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও বাড়ে। আর একজন যুবক যখন বেকারত্বের পরিবর্তে একটি পেশাকে জীবনের পথ হিসেবে বেছে নিতে পারেন, তখন তার প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারে।

এই জায়গা থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান কারিগরি প্রশিক্ষণকে শুধু একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন বদলের সম্ভাবনা, আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার গল্প ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সুযোগ।

আরও পড়ুন

জামালপুর-ঢাকা রুটে বাস ধর্মঘট, বিপাকে সাধারণ মানুষ

পাহাড়ের তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তোলা, নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা ও পাহাড়ি-বাঙালি তরুণদের পারস্পরিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর মাধ্যমে এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান, সামাজিক সম্প্রীতি ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

দুর্গম পাহাড়ে সুযোগ সবসময় হাতের কাছে আসে না। তাই যখন কোনো তরুণ প্রথমবারের মতো মোবাইল ফোন মেরামত শেখেন, কোনো নারী নার্সিংয়ের প্রশিক্ষণ নেন কিংবা কোনো যুবক কম্পিউটারে বসে ফ্রিল্যান্সিংয়ের সম্ভাবনা খুঁজে পান, তখন সেটি নিছক প্রশিক্ষণের ঘটনা থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সম্ভাব্য সূচনা।

ভোরের আকাশ/সু.পা

শেয়ার করুন: