ছেলের জীবন বাঁচাতে আকুতি অসহায় বাবার

জীবন যেন নিভু নিভু জ্বলছে। এই বয়সে যেখানে বই হাতে পড়ার টেবিলে থাকার কথা ছিল, সে যেন মৃত্যুর প্রহর গুণছে। দুইটি কিডনি বিকল হওয়ায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। অসহায় পরিবারে জন্ম নেওয়া নাইমুল ইসলাম যেন এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। হত-দরিদ্র মা-বাবা টাকার অভাবে চিকিৎসাও করতে পারছে না তার। ভিটে-বাড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই পরিবারের। কি করে চিকিৎসা করবে তাকে? বলছিলাম টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার হাবলা ইউনিয়নের বিলপাড়া (উত্তরপাড়া) গ্রামের নাইমুল ইসলামের কথা।
নাইমুল ইসলাম (১৮) ওই গ্রামের আলী আজম মিয়ার ছোট ছেলে। তিনি কাঞ্চনপুর এলাহিয়া বিএ ফাজিল মাদ্রাসার একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অসুস্থ নাইমুল ইসলাম চেয়ারে বসে আছে। চোখের কোণে জমে আছে জল। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর শুয়ে পড়ে সে। একটানা বসে ও শুয়ে থাকতে কষ্ট হয়। বাড়িতে একটি ঘর আছে, সেখানেই তাদের বসবাস। বাড়ির ৬ শতাংশ জমি ছাড়া তাদের আর কিছুই নেই।
জানা যায়, উপজেলার হাবলা ইউনিয়নের বিলপাড়া গ্রামের নাইমুল ইসলামের দুটি কিডনি বিকল। নাইমুল ইসলাম কাঞ্চনপুর এলাহিয়া বিএ ফাজিল মাদ্রাসার একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। সে অসুস্থতার কারণে একদিন ক্লাস করতে পারেনি। এ বছর রমজানের শেষ দিকে নাইমুল ইসলাম অসুস্থ হয়ে পড়ে। হাত-পা ফুলে যায়, হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। তারপর তাকে হাসপাতালে নিয়ে পরীক্ষা করালে দুটি কিডনি বিকল বলে জানান চিকিৎসক। কয়েকবার তাকে চিকিৎসা করা হয়েছে। টাকার অভাবে থেমে আছে তার চিকিৎসাসেবা। প্রতি সপ্তাহে একবার করে ডায়ালাইসিস করতে হয়। প্রতি সপ্তাহে লাগে রক্ত। এ নেগেটিভ রক্ত পেতে তাদের কষ্ট হয়। এক সপ্তাহে রক্ত না পেলেই নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় তার। টাকার অভাবে অসহায় মা-বাবাও পারছে না তার চিকিৎসা করার জন্য। প্রতি সপ্তাহে যে টাকা খরচ হচ্ছে সে টাকা জোগাড় করতে পারছে না পরিবার। অসহায় পরিবার, বাড়ির ৬ শতাংশ জমি ছাড়া কিছুই নেই। কেউ যদি তাদের সাহায্য করে তাহলে তার ওষুধ ও চিকিৎসা করতে পারে। তার চিকিৎসার জন্য বিত্তবান ও সরকারি সহযোগিতা চেয়েছেন স্থানীয়রা।
অসুস্থ নাইমুল ইসলাম বলেন, নিজের অজান্তে কখন যে শরীরে রোগ বাসা বেঁধেছে, নিজেও বুঝতে পারিনি। ৭ মাস আগে হঠাৎ করে হাত-পা ফুলে যায়। হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার দুইটি কিডনি বিকলের কথা বলে। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম, কিন্তু একদিনও ক্লাস করতে পারিনি। প্রতি সপ্তাহে ডায়ালাইসিস ও রক্ত নিতে হয়। রক্ত না দিলেই নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা নেমে আসে, তখন মনে হয় নিঃশ্বাসটা যেন বন্ধ হয়ে আসছে।
নাইমুল ইসলামের মা মুন্নি বেগম বলেন, আমরা খুবই অসহায় মানুষ, টাকার অভাবে ছেলের চিকিৎসা করতে পারছি না। ৭ মাস আগে ছেলের কিডনিতে সমস্যা ধরা পড়ে। ডাক্তার বলে, দুইটি কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। নিজেদের কাছে যা ছিল তা দিয়ে ছেলের চিকিৎসা করেছি। এছাড়া মানুষের কাছে হাত পেতে ও টাকা চেয়ে কয়েকবার ছেলেকে ডাক্তার দেখিয়েছি। আমাদের আর কিছুই নাই। বিত্তবান ও সরকার যদি আমাদের সহযোগিতা করে, তবেই আমার ছেলের চিকিৎসা করতে পারব। প্রতি সপ্তাহে ডায়ালাইসিস করতে হয়। যখন ছেলের পেট ব্যথা শুরু হয়, তখন সে 'মা' বলে চিৎকার করে।
নাইমুল ইসলামের বাবা আলী আজম মিয়া বলেন, টাকার অভাবে ছেলের ঠিকমতো চিকিৎসা করতে পারছি না। ছেলেটা এভাবে অসুস্থ হয়ে পড়বে, কখনো ভাবিনি। আমাদের ৬ শতাংশ বাড়ির জমি ছাড়া আর কিছুই নাই। নিজের যা ছিল, সব ছেলের অসুস্থতার জন্য খরচ করেছি। ছেলের দুইটি কিডনি বিকল হয়ে গেছে। ছেলে আমার জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
তিনি আরও বলেন, প্রতি সপ্তাহে ৭-৮ হাজার টাকা লাগে। এই টাকা আমি কোথায় পাব? প্রতি সপ্তাহে ডায়ালাইসিস করতে হয়, শরীরে দিতে হয় রক্ত। রক্ত পেতেও সমস্যা হয়। ছেলের মুখের দিকে তাকাতে পারি না। কোনো রকমে আমাদের সংসার চলছে। আমার একটি গাভি আছে, সেই গাভির দুধ বিক্রি করে সংসার চালাই। আমি আমার ছেলের জীবন বাঁচাতে সকলের সহযোগিতা চাই।
স্থানীয় বাসিন্দা সামছুল আলম বলেন, ৭ মাস ধরে নাইমুল খুব অসুস্থ। তার দুটি কিডনি বিকল হয়ে গেছে। এটি একটি অত্যন্ত অসহায় পরিবার, বাড়ি ছাড়া তাদের আর কিছু নাই। কয়েকবার চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলেও আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারছে না। বিত্তবান ব্যক্তিরা যদি এগিয়ে আসেন, তাহলে তার চিকিৎসা করা সম্ভব। পাশাপাশি, সরকার যেন তাকে সহযোগিতা করে—এই আবেদন জানাই।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় নাইমুল ইসলামের পরিবার তার ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারছে না। তারা একদম অসহায়। ছেলেটি ৭ মাস যাবত অসুস্থ, টাকার অভাবে চিকিৎসা বন্ধের উপক্রম। গ্রামবাসী যে সাহায্য করছে, তাতে তার চিকিৎসার খরচ মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। আমরা চাই, হৃদয়বান ও বিত্তবান ব্যক্তিরা যেন তার পাশে দাঁড়ান।
বাসাইল উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আসাদুল ইসলাম বলেন, শুনেছি নাইমুল ইসলামের দুটি কিডনি বিকল হয়ে গেছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন জেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে ক্যানসার, কিডনি, স্ট্রোকে প্যারালাইসিস, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়ার মতো জটিল রোগের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এই খাতে এক লাখ টাকা অনুদানের সরকারি বিধান রয়েছে। রোগীর পরিবার বা আত্মীয়-স্বজন যদি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তবে আমরা নিয়ম অনুযায়ী এই সহযোগিতার ব্যবস্থা করতে পারব।
ভোরের আকাশ/ এনউব