আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রাখাইন
এক বছর ধরে অচল টেকনাফ স্থলবন্দর, বাড়ছে সীমান্ত চোরাচালান

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় গত এক বছর ধরে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র টেকনাফ স্থলবন্দর। ফলে দুই শতাধিক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার পণ্য মিয়ানমারে আটকে আছে। একই সঙ্গে সরকার প্রতি মাসে প্রায় ১২০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। বন্দর সংশ্লিষ্ট প্রায় ৪০০ আমদানি-রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জীবিকা এখন মারাত্মক সংকটে।
নিস্তব্ধ বন্দরে নেই কর্মচাঞ্চল্য
গত ১২ মার্চ সরেজমিনে টেকনাফ স্থলবন্দর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একসময় কর্মচাঞ্চল্যে ভরপুর বন্দরটি এখন প্রায় ফাঁকা। নেই কোনো পণ্যবোঝাই ট্রাক, নেই শ্রমিকের কোলাহল। নাফ নদীর তীরের জেটিতেও দেখা যায়নি কোনো ট্রলার বা জাহাজ। বন্দরের আশপাশের অধিকাংশ দোকানপাটও বন্ধ। একসময় বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদী পাড়ি দিয়ে মিয়ানমার থেকে কাঠ, হিমায়িত মাছ, পেঁয়াজ, আদা, মরিচ ও সুপারিসহ নানা পণ্য টেকনাফ বন্দরে আসত। প্রতিদিন বন্দরের জেটিতে ভিড়ত ৩০ থেকে ৪০টি পণ্যবোঝাই জাহাজ। সেখান থেকে শত শত ট্রাকে এসব পণ্য চট্টগ্রাম, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হতো। প্রায় দুই হাজার শ্রমিকের কর্মব্যস্ততায় মুখর থাকত পুরো বন্দর এলাকা। এখন সেখানে বিরাজ করছে শূন্যতা।
নিরাপত্তা ঝুঁকিতে বন্ধ বাণিজ্য
বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, বঙ্গোপসাগর হয়ে মিয়ানমার থেকে কোনো ট্রলার বা জাহাজ নাফ নদীতে প্রবেশ করলে আরাকান আর্মির গুলি বা জাহাজ আটকানোর ঝুঁকি থাকে। এই পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের ৩ মার্চ থেকে টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এক বছর পার হলেও এখনো চালু হয়নি সীমান্ত বাণিজ্য।
শ্রমিকদের দুর্দশা
বন্দর শ্রমিক নুর কামাল (৪২) বলেন, “আগে প্রতিদিন মাল খালাস করে ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা আয় করতাম। সেই টাকায় পাঁচ সদস্যের সংসার চলত। এক বছর ধরে কাজ নেই। দুই ছেলের পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে গেছে।”
শ্রমিকদের দলপতি শামসুল আলম জানান, বন্দরে আগে দুই হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করতেন। বর্তমানে তাদের প্রায় ৯৫ শতাংশ বেকার হয়ে পড়েছেন।
ব্যবসায়ীদের হাজার কোটি টাকার পণ্য আটকে আছে
টেকনাফ স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এহতেশামুল হক বাহাদুর বলেন, দীর্ঘদিন বাণিজ্য বন্ধ থাকায় প্রায় ২০০ ব্যবসায়ী চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। তার মতে, মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন ও সিত্তে বন্দরে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার পণ্য আটকে রয়েছে।
টেকনাফ স্থলবন্দর ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি মো. ওমর ফারুক জানান, আটকে থাকা পণ্যের মধ্যে রয়েছে কাঠ, সুপারি, বরই, তেঁতুল, হিমায়িত মাছ ও শুঁটকি। দীর্ঘদিন গুদামে পড়ে থাকার কারণে শত কোটি টাকার পেঁয়াজ ও আদা ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে।
রাখাইনে যুদ্ধ পরিস্থিতি
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাখাইন রাজ্যে বর্তমানে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র সংঘাত চলছে। সিত্তে বন্দরের কাছাকাছি এলাকায় আরাকান আর্মির অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। জান্তা বাহিনী বিমান ও নৌ হামলা চালালেও স্থলযুদ্ধে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষে জান্তা বাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও তিনজন মেজরসহ অন্তত ১১৬ জন নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। যুদ্ধের কারণে স্থানীয় বেসামরিক লোকজন এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
রাজস্ব ক্ষতি বাড়ছে
শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৩ মার্চ টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমার থেকে ৬৭৫ দশমিক ৪৩ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছিল। এতে সরকার প্রায় ৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা রাজস্ব পেয়েছিল। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ৩ হাজার ৪৫৫ মেট্রিক টন আলু, বিস্কুট, পানীয় ও প্লাস্টিক পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করা হয়েছিল।
শুল্ক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বাণিজ্য বন্ধ থাকায় সরকার প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। এক বছরে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।
বন্দর কর্তৃপক্ষের লোকসান
টেকনাফ স্থলবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী জানান, এক বছর ধরে বাণিজ্য বন্ধ থাকায় তাদেরও প্রতি মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
বাড়ছে সীমান্ত চোরাচালান
বন্দর বন্ধ থাকলেও সীমান্তে চোরাচালান থেমে নেই। সীমান্ত সূত্র জানায়, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম, থানচি এবং কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার অন্তত ৪৩টি পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিত পণ্য পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে চাল, ডাল, ওষুধ, ভোজ্যতেল, সার, জ্বালানি ও সিমেন্ট মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে। বিপরীতে মিয়ানমার থেকে আসছে ইয়াবা, আইস ও অস্ত্রের চালান। সম্প্রতি জ্বালানি তেল পাচারও বেড়েছে।
বিজিবি ও কোস্টগার্ড সূত্রে জানা গেছে, গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত দেড় মাসে সীমান্তে প্রায় ৪৫টি অভিযান চালিয়ে ৩০০ কোটি টাকার বেশি মাদক ও চোরাই পণ্য জব্দ করা হয়েছে।
টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হানিফুর রহমান বলেন, সীমান্তে মাদক ও অস্ত্র পাচার ঠেকাতে ড্রোন, থার্মাল ইমেজার, রাডার, আধুনিক নৌযান ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
বাণিজ্য চালুর আলোচনা
সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় টেকনাফ স্থলবন্দর চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, রাখাইনের পরিস্থিতির কারণে এতদিন বাণিজ্য বন্ধ ছিল। এখন এটি চালুর বিষয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুস শুক্কুর বলেন, সীমান্ত চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে দ্রুত টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে বাণিজ্য চালু করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “এ জন্য মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গেও সমন্বয় জরুরি।”
সীমান্ত বাণিজ্যের ইতিহাস
চোরাচালান নিরুৎসাহিত করতে ১৯৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য চালু করা হয়েছিল। শুরুতে চোরাচালান কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও পরবর্তী সময়ে তা আবার বাড়তে থাকে।
কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, সীমান্ত চোরাচালান বন্ধ করতে টেকনাফ স্থলবন্দর চালু করা হয়েছিল। বর্তমানে বন্দর অচল থাকায় চোরাচালান বেড়েছে কয়েকগুণ।
তিনি জানান, সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ে পর্যালোচনা চলছে। আশা করা হচ্ছে দ্রুতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
ভোরের আকাশ/নি