লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে জলাতঙ্কের টিকা সংকট, বিপাকে রোগীরা

লক্ষ্মীপুর ১০০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ে আহত হয়ে প্রতিদিন শতাধিক মানুষ হাসপাতালে এলেও সরকারি টিকা না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।
অনেকেই বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে বেশি দামে ভ্যাকসিন কিনে আনছেন, আর অর্থাভাবে অসংখ্য গরিব রোগী টিকা না নিয়েই বাড়ি ফিরছেন। এতে প্রাণঘাতী জলাতঙ্ক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরে সদর হাসপাতালে জলাতঙ্কের টিকা সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৭০ জন রোগী কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড় নিয়ে চিকিৎসার জন্য এখানে আসেন। গত সাত মাসে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রাণীর কামড়ে আহত হয়ে প্রায় ৭ হাজার মানুষ এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। আক্রান্তদের বড় অংশই নারী ও শিশু।
টিকা কক্ষে ভিড়, কিন্তু নেই ভ্যাকসিন সম্প্রতি সরেজমিনে সদর হাসপাতালের নিচতলায় জরুরি বিভাগের পাশের জলাতঙ্ক টিকা কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, অনেক রোগী সেখানে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু কক্ষের দরজায় ঝুলছে একটি নোটিশ- “জলাতঙ্কের টিকা সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।”
হাসপাতালে এসে টিকা না পেয়ে অনেক রোগী হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার শেষ ভরসা হিসেবে বাইরের ফার্মেসির দ্বারস্থ হচ্ছেন।
সংকটের কারণে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতিও দেখা গেছে। কুকুর বা বিড়ালের কামড়ে আহত চারজন রোগী মিলে একটি ভ্যাকসিন কিনে তা ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। বাজারে ৫ মিলিগ্রামের একটি টিকার দাম প্রায় ৪৫০ টাকা। তবে সংকটের সুযোগে কিছু ফার্মেসিতে দুই থেকে তিন গুণ বেশি দামেও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
জকসিন এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আসমা আক্তার বলেন, “তিন মাস আগে আমাকে কুকুরে কামড় দিয়েছিল, তখনও বাইরে থেকে টিকা কিনতে হয়েছে। এবার আমার বোনের মেয়েকে নিয়ে এসেছি। এখানেও চারজন মিলে টিকা কিনে নিতে হয়েছে। হাসপাতালে এসে টিকা না পেয়ে খুব ভোগান্তি হচ্ছে।”
আরেক রোগী রাণী বেগম বলেন, “আমাদের মতো সাধারণ মানুষ হাসপাতালে সেবা নিতে এসে যখন শুনি টিকা নেই, তখন খালি হাতে ফিরে যেতে হয়। টাকা না থাকলে বাইরে থেকেও টিকা কেনা সম্ভব হয় না।”
রোগীর স্বজন আবুল হোসেন বলেন, “হাসপাতালে টিকা নেই, আবার বাইরের ফার্মেসিতেও ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে অনেক মানুষ টিকা না পেয়ে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হতে পারে।”
সদর হাসপাতালের সামনে একটি ফার্মেসির ব্যবসায়ী মো. বেলায়েত জানান, “ভ্যাকসিনের জন্য কোম্পানিগুলোকে অর্ডার দিলেও তারা দিতে পারছে না। তারা বলছে বিমানবন্দরে আগুন লাগার কারণে ভ্যাকসিন তৈরির কাঁচামাল নষ্ট হওয়ায় উৎপাদনে সমস্যা হয়েছে।”
হাসপাতালের টিকা কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র স্টাফ রোকনুজ্জামান বলেন, “গত ৮ তারিখ থেকে হাসপাতালে জলাতঙ্কের টিকা নেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। টিকা সরবরাহ পেলেই আবার রোগীদের দেওয়া হবে। যারা বাইরে থেকে কিনে আনছেন, তাদের আমরা টিকা দিয়ে দিচ্ছি।”
সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আবু হাসান শাহীন বলেন, “স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা জানিয়েছে বর্তমানে সারা দেশেই জলাতঙ্কের টিকার সংকট রয়েছে। বিমানবন্দরে আগুন লাগার কারণে ভ্যাকসিন তৈরির কাঁচামাল নষ্ট হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। যেসব ফার্মেসিতে টিকা পাওয়া যাচ্ছে সেখান থেকে এনে নেওয়ার জন্য রোগীদের বলা হয়েছে। কেউ অতিরিক্ত দাম নিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
চিকিৎসকদের মতে, কুকুর, বিড়াল, বানর, বাদুড়, বেজি ও শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ে জলাতঙ্ক রোগের ঝুঁকি থাকে। আক্রান্ত প্রাণীর মাধ্যমে ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলে দ্রুত টিকা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সময়মতো টিকা না নিলে এই রোগ প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
জলাতঙ্কের টিকার দীর্ঘদিনের সংকটে উদ্বেগ প্রকাশ করে রোগী ও স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত হাসপাতালে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
ভোরের আকাশ/ র.ই