নাজিরপুরে কুল চাষে ঝুঁকছে কৃষক

কম খরচে বেশি লাভ, বাজারে ভালো চাহিদা ও তুলনামূলক কম ঝুঁকির কারণে পিরোজপুরের অনেক কৃষক ধান বা অন্যান্য ফসলের পরিবর্তে বড়ই বা কুল চাষের দিকে ঝুঁকছেন। বড়ই গাছ অল্প সেচেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। ঠিকমতো পরিচর্যা করলে একবার গাছ লাগালে কয়েক বছর ধরে ফল পাওয়া যায়। বড়ই চাষ করে নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার তারাবুনিয়া গ্রামের বরই বাগানের ভেতরে প্রবেশ করলে গাছে ঝুলতে দেখা যায় সবুজ-হলুদ ও লালচে বড়ই। আকারে বড় ও স্বাদে সুমিষ্ট হওয়ায় বাগানেই বিক্রি হয়ে যায় সব বরই। সাধারণত আপেল, বল সুন্দরী, থাই ও কাশ্মীরী বড়ই বেশি চাষ হয়। একটি গাছ থেকে গড়ে ৩০কেজি বড়ই তোলা সম্ভব।
পিরোজপুরের বড়ই জেলার চাহিদা মিটিয়ে ঢাকা, চট্রগ্রাম ও বরিশাল সহ অনান্য জেলায় বিক্রয় হয়। কম খরচে বেশি ফলন পাওয়ায় বরই চাষে দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে স্থানীয় চাষিদের। একবার গাছ লাগানোর পর কয়েক বছর ধরে ফলন পাওয়া যায়, যা কৃষকদের জন্য নিয়মিত আয়ের সুযোগ তৈরি করছে।
এছাড়া বাজারে বড়ইয়ের চাহিদা বেশি থাকায় ন্যায্য দাম পাওয়ায় এলাকার কৃষকেরা ধান চাষের পরিবর্তে বড়ই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। ধান চাষ করে খরচ উঠাতে না পারলেও বড়ই চাষ করে ভাগ্যের পরিবর্তন করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। কম খরচে হচ্ছেন অধিক লাভবান। একই জমি থেকে আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আয় করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বড়ই চাষীরা।
পিরোজপুর জেলার সাতটি উপজেলায় প্রায় ১৪৬ হেক্টর জমিতে বড়ই চাষ হয়। যা থেকে প্রায় ১৩ শত ২১ মেট্রিক টন বড়ই উৎপাদন হচ্ছে। যার বাজার মুল্য প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা।
বড়ই চাষী বীরেন বিশ্বাস বলেন, বড়ই চাষ করে আমরা অধিক লাভবান হচ্ছি। থাই কুল, বল সুন্দরী, বাও কুল সহ বিভিন্ন প্রজাতির বড়ই উৎপাদন হয় এই এলাকায়। এই এলাকার অধিকাংশ মানুষ বড়ই চাষের সাথে জড়িত। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দামে বিক্রি হয়। কখনো ৪ হাজার, কখনো সাড়ে তিন হাজার করে আমরা বিক্রি করি। প্রতি একর বড়ই চাষে আমাদের ২৫ হাজার টাকা করে খরচ হচ্ছে। প্রতি বিঘায় ২ লক্ষাধিক টাকার ইনকাম হয়।
বীরেন বিশ্বাসের স্ত্রী বলেন, বড়ই বাগানে বড়ই তুলি, পরিচর্যা করি, বিভিন্ন জায়গা থেকে পাইকাররা আসে তাদের কাছে বড়ই বিক্রি করি। পিরোজপুর, ইন্দেরহাট, নাজিরপুর সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বড়ই কিন্তু এখানে পাইকাররা আসে। প্রতিটি গাছে স্প্রে করা লাগে, সার ওষুধ দেয়া লাগে। আগাছা নিরানো লাগে। এ ধরনের কাজ বাগানে করে থাকি।
তারাবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা নারায়ণ চন্দ্র বলেন, আমাদের এই তারাবুনিয়া গ্রামে ৯০% মানুষ বড়ই চাষের সাথে জড়িত। এছাড়াও লিচু চাষ, আম চাষ সহ অন্যান্য ফল চাষ করে থাকে এই এলাকার মানুষ। প্রতি কেজি বড়ই ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আরমান শেখ বলেন, এলাকার মানুষ বড়ই, আম, লিচু সহ বেশ কয়েকটি ফল উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহ করে। স্বরূপকাঠি, ইন্দেরহাট, পিরোজপুর, কাউখালী সহ অনেক জায়গা থেকে পাইকাররা এসে এখানে বড়ই কিনে নিয়ে যায়। ধান উৎপাদনের থেকে এখন বড়ই উৎপাদন বেশ লাভজনক। স্থানীয় কৃষকেরা বড়ই উৎপাদনের দিকে ঝুকছে।
জেলা কৃষি সম্পসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) মো. হারুন অর রশিদ বলেন, পিরোজপুর জেলায় ১৪৬ সেক্টরে কুল চাষ হয়। এ জেলায় তিনটি জাতের বড়ই আবাদ হয়। নারিকেলি, বল সুন্দরী এবং ভারত সুন্দরী। মোট উৎপাদনের পরিমাণ ১৩২১ মেট্রিক টন।
বড়ই চাষীদের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে সকল ধরনের সহযোগিতা এবং প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এছাড়াও রোগ বালাই, সার ব্যবস্থাপনা সহ কৃষকের পরামর্শের জন্য মাঠ পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক তাদেরকে সহযোগিতা করছে।
পরিকল্পিতভাবে বড়ই চাষ করা গেলে কৃষকদের আর্থিক স্বচ্ছলতাও বাড়বে এবং দেশের ফল উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ভোরের আকাশ/ র.ই