রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ৩৫ বছর আগের সমীক্ষার প্রকল্পে সর্বস্ব হারানোর পথে শতাধিক পরিবার

৩৫ বছর আগের সমীক্ষা দিয়ে ১৪শ কোটি টাকা ব্যয়ে তিস্তা সেচ ক্যানেল সংস্কার ও স¤প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। দীর্ঘ সময় পর প্রকল্পের স¤প্রসারনের কাজ শুরু করায় ব্যাক্তিগত বসতবাড়ি, আবাদি জমি, এমনকি সড়কও রয়েছে নকশায়। প্রকল্পটির পুনরায় কাজ শুরুর পরে ভিটেমাটি হারিয়ে সর্বস্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন শতাধিক পরিবার।
পানি উন্নয়ন বোর্ড রংপুরের ত্তাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালে ১৪শ ৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে দ্বিতীয় ফেসে পানি উন্নয়ন বোর্ড রংপুর অঞ্চলে তিস্তা সেচ ক্যানেল সংস্কার ও স¤প্রসারণের কাজ শুরু করে, যে প্রকল্পের সমীক্ষা করা হয় ৩৫ বছর আগে। অপরদিকে অভিযোগ রয়েছে ৯০ এর দশকে তিস্তা সেচ প্রকল্প চালু হলেও পানির অভাবে কখনই সেচের কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি এই প্রকল্প।
সরেজমিনে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নের ব্রমোত্তর পাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় গ্রামটির দুই পাশে তিস্তা সেচ স¤প্রসারণ প্রকল্পের কাজ চলমান। এই গ্রামেই বসবাস শতাধিক পরিবারের। কয়েক প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা এই জনপদের ওপর দিয়েই নির্মাণ করা হবে তিস্তা সেচ ক্যানেলের স¤প্রসারিত অংশ। প্রকল্পটি সম্পূর্ণরুপে বাস্তবায়িত হলে বিলীন হয়ে যাবে ব্রমোত্তর পাড়া গ্রাম।
স্থানীয়রা জানান, ক্যানেলের জন্য যে জমিগুলোকে নির্বাচিত করা হয়েছে, এসব জমির অনেকটাই পৈতৃক সূত্রে পাওয়া, আবার কেউ কিনেছেন কষ্টের টাকায়। তবে জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে তারা আগে থেকে কিছুই জানতেন না। এমনকি ক্ষতিপূরণের টাকাও পাননি।
স্থানীয় বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, শত বছরের বেশি সময় ধরে আমার পূর্ব পুরুষরা এই ভিটাতেই বসবাস করছেন । বেশ কিছুদিন আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড কতৃপক্ষ সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। বাড়ি ভেঙে জমি খালি করার নোটিশ দেয়া হয়েছে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দাবি, এসব জমি অধিগ্রহন করা হয়েছে আশির দশকে। সেসময় রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণসহ ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধ করা হয়েছিলো। কিন্তু প্রকল্প চলমান না থাকায় অধিগ্রহণকৃত জমিগুলো দেখভাল না করায় ক্রমান্বয়ে অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে।
তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানি বলেন, ৩৫ বছর আগে যে সমীক্ষাটা করা হয়েছে। সমীক্ষার সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ যুক্ত ছিলো কিনা। পানি প্রাপ্তির চিন্তা না করেই যদি সমীক্ষাটা হয়, তাহলে এটা বিজ্ঞানসম্মত সমীক্ষা হয়নি। ৩৫ বছর আগের তিস্তা আর এখনকার তিস্তা কিন্তু এক না। এখনকার তিস্তা শুষ্ক মৌসুমে কিন্তু পানিই পাচ্ছে না। তিস্তার পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত না করে বিপুল অর্থের এই প্রকল্প শুধুই অর্থের অপচয়।
তিনি আরো বলেন, জলাধার নির্মাণ না করে, পানির সংকট সমাধান না করে তিস্তা সেচ ক্যানেল স¤প্রসারণ যে প্রকল্প, এটি কারিগরি দিক থেকেও বিজ্ঞানসম্মত নয়।
ইতিমধ্যেই আগের সরকারের আমলে তারা ১৪০০ কোটি টাকার খাল স¤প্রসারণ প্রকল্প হাতে নিয়েও খালের পাড়ের মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারে নাই। খালের পাড়ের মানুষ বলছে পানি নাই, খাল আছে। সেই খাল বালুময় হয়ে যাচ্ছে। আমরা অতিসত্বর তিস্তা সেচ ক্যানেল সংস্কার ও স¤প্রসারণ প্রকল্প এলাকা পুনঃ সমীক্ষার দাবি জানাচ্ছি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড রংপুরের তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জানান, গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর এর ক্যানেলটার জমি অধিকরণ শেষ হয় ১৯৯৫ সালে। কনস্ট্রাকশন এর কাজ শুরু হয় ১৯৯৬/১৯৯৭ সালে। ক্যানেলের আংশিক অংশটা সে সময় নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পটা দ্রæত শেষ করার কারণে বাকি অংশটা সে সময় নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি।
১৯৯৫/৯৬ সালে ওই এলাকায় কোন জনবসতি ছিলো না,এতো লোকজনও ছিলো না। আর যেহেতু এখন ২০২৬ সাল। ৩০ বছর পর। এর মধ্যে স্থানীয় জনগণ বিভিন্নভাবে এখানে জনবসতি গড়ে তুলেছ্।
তিনি আরো বলেন, জনগণ জানতো এটা একুইজিশন করা। ওই সময় নোটিশ করা হয়েছে। অনেকে টাকাও নিয়ে নিছে। কেউ কেউ হয়তোবা তাদের কাগজে সমস্যার কারণে ওই সময় টাকা গ্রহণ করে নাই। মূল মালিকরা অনেকেই হয়তো মৃত্যুবরণ করেছে,অনেকেই জমি বিক্রি করেছ্।েযে জিনিসটা আমরা অবগত না। এটা যেহেতু সরকারি একুইজিশন করা ল্যান্ড। আমাদের প্রকল্প পাশ হয়েছে। ঠিকাদার নিযুক্ত করা হয়েছে। আমরা এই কাজটা এখন করতে বাধ্য। এটা সম্পূর্ণভাবে জনগণকে সেচের পানি সরবরাহের জন্য প্রকল্প। এখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত কোন স্বার্থ নেই। ওই এলাকায় তিস্তা নদীর পানি দিয়ে আমরা সেচ প্রকল্পে সহযোগিতা করতে পারবো। এর মাধ্যমে জনগণ উপকৃত হবে। তবে তিন দশক আগের সমীক্ষা দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং অধিগ্রহণ করা জমি দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণ না করার বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি এই কর্মকর্তা।