দুই পা হারিয়েও থামেনি জীবনযুদ্ধ, অদম্য হাসিদুলের সংগ্রাম অনুপ্রেরণা

স্বপ্ন ছিল পরিবারের হাল ধরার, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বদলে দেয় জীবনের পুরো গল্প। তবুও হার মানেননি গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর তরুণ হাসিদুল ইসলাম। দুই পা হারিয়েও আজ তিনি লড়ছেন আত্মসম্মান, সাহস আর বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী পৌর এলাকার উদয়সাগর হাজীপাড়ার ২৪ বছর বয়সী হাসিদুল ইসলাম। একসময় অন্যসব তরুণের মতোই ছিল তার স্বাভাবিক জীবন। ছিল স্বপ্ন, ছিল পরিবারকে নিয়ে সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যাশা। কিন্তু ২০১৬ সালে অসুস্থ হয়ে মারা যান তার বাবা। এরপর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে মাকে নিয়ে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় পাড়ি জমান তিনি।
ঢাকায় একটি গার্মেন্টস কারখানায় চাকরি শুরু করেন হাসিদুল। তবে ২০২০ সালে করোনা মহামারির ধাক্কায় চাকরি হারিয়ে ফিরে আসেন নিজ উপজেলা পলাশবাড়ীতে। পরে বড় ভাইয়ের সঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। জীবন আবারও স্বাভাবিক পথে ফিরছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম আঘাত আসে হঠাৎই। একদিন শহরের একটি বহুতল ভবনের ছাদে কাজ করার সময় ৩২ হাজার ভোল্টের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুতের তারের সঙ্গে শর্টসার্কিট হয়ে গুরুতর আহত হন হাসিদুল। দীর্ঘ দুই মাস মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের পর প্রাণে বেঁচে ফিরলেও হারাতে হয় তার দুই পা। শরীরের বিভিন্ন অংশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দুর্ঘটনার পর দীর্ঘদিন পরিবার ও স্বজনদের সহায়তায় চললেও অভাবের সংসারে সেই সহায়তা ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু জীবনযুদ্ধে থেমে যাননি হাসিদুল। মানুষের কাছে হাত না পেতে আত্মসম্মানকে সঙ্গী করেই নতুনভাবে বাঁচার পথ খুঁজেছেন তিনি।
এলাকাবাসীর সহযোগিতা ও ধারদেনা করে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কিনে বর্তমানে সেটি চালিয়েই জীবিকা নির্বাহ করছেন এই অদম্য তরুণ। ছোট্ট একটি ভিটেবাড়ি আর অসুস্থ বৃদ্ধা মাকে নিয়েই তার সংসার।
হাসিদুলের বড় ভাই হাসান মিয়া বলেন, দুর্ঘটনার পরও হাসিদুল কখনো ভেঙে পড়েনি। অনেক কষ্ট হলেও সে ভিক্ষা না করে পরিশ্রম করে জীবন চালানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু আমি নিজেও দিনমজুর মানুষ। সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়। সরকার যদি ওর জন্য সম্মানজনক কোনো কাজের ব্যবস্থা করত, তাহলে অনেকটা চিন্তামুক্ত থাকা যেত।
স্থানীয় ওয়াহেদ মিয়া বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও হাসিদুল যেভাবে সংগ্রাম করে জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষ তার পাশে দাঁড়ালে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন তিনি।
আক্ষেপ নিয়ে হাসিদুল ইসলাম বলেন, অনেকেই আমাকে ভিক্ষা করতে বলে। কিন্তু আত্মসম্মানের কারণে সেটা পারি না। কষ্ট হলেও অটোরিকশা চালিয়েই জীবিকা নির্বাহ করছি। তবে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। যাত্রীদের মালামাল উঠানো-নামানো আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। আবার পা না থাকায় অনেকে ভয় পেয়ে রিকশায় উঠতেও চান না।
তিনি আরও বলেন, কেউ যদি ছোটখাটো কোনো ব্যবসা বা বসে করার মতো কাজের ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে মাকে নিয়ে সম্মানের সঙ্গে জীবন চালাতে পারতাম।
এ বিষয়ে পলাশবাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শেখ জাবের আহমেদ ভোরের আকাশকে বলেন, হাসিদুল ইসলামের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সহায়তার চেষ্টা করা হবে। তার ইচ্ছা অনুযায়ী স্থানীয় ভাবে চাকরির করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
দুই পা হারিয়েও থেমে যায়নি হাসিদুল ইসলামের জীবনসংগ্রাম। প্রতিকূলতার কাছে হার না মেনে আত্মসম্মান আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে এগিয়ে চলা এই তরুণ আজ অনেকের কাছেই সাহস ও অনুপ্রেরণার প্রতীক। সমাজের সহমর্মী মানুষ এবং সরকারি সহযোগিতা পেলে হয়তো নতুন স্বপ্ন নিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন হাসিদুল।
ভোরের আকাশ/এনউব