আলমডাঙ্গায় হাজী বিরিয়ানি হাউজের বিরিয়ানি খেয়ে ৯ জন অসুস্থ

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা পৌর শহরের হাইরোডে হাজী বিরিয়ানি হাউজ থেকে কেনা বিরিয়ানি খেয়ে একই পরিবারের তিন সদস্যসহ অন্তত ৯ জন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তীব্র পেটব্যথা, বমি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তাঁরা বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ওই দোকানের বিরিয়ানি খাওয়ার পরই তাঁদের অসুস্থতার সূত্রপাত হয়।
ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। খাবারের মান, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না—তা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। একই খাবার খাওয়ার পর একাধিক ব্যক্তি অসুস্থ হওয়ার ঘটনায় বিষয়টি দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে আলমডাঙ্গা থানা-সংলগ্ন হাজী বিরিয়ানি হাউজ থেকে পৃথক সময়ে কয়েকটি পরিবার বিরিয়ানি কিনে বাড়িতে নিয়ে যায়। রাতে পরিবারের সদস্যরা ওই খাবার খাওয়ার পর মধ্যরাত থেকেই একে একে শুরু হয় পেটব্যথা, বমি ও ডায়রিয়া। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরদিন মঙ্গলবার তাঁদের চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
অসুস্থদের মধ্যে রয়েছেন আলমডাঙ্গা উপজেলার নাগদাহ ইউনিয়নের জোড়গাছা গ্রামের ফারুক হোসেনের স্ত্রী মরিয়ম খাতুন (২৭) এবং তাঁদের দুই সন্তান তাওহিদ (২) ও তাওসিফ (৮)। এছাড়া জেহালা ইউনিয়নের রোয়াকুলি গ্রামের জিনারুল ইসলাম (৪৬), তাঁর স্ত্রী পান্না খাতুন (৪২) ও ছেলে সাহেদ (১৩) এবং চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার আলুকদিয়া ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের একই পরিবারের আরও তিন সদস্য হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
ভুক্তভোগী ফারুক হোসেন বলেন, অফিস শেষে আলমডাঙ্গার হাজী বিরিয়ানি হাউজ থেকে বিরিয়ানি কিনে বাড়িতে নিয়ে যান তিনি। রাতে স্ত্রী ও দুই সন্তান ওই খাবার খাওয়ার পর রাত ১২টার পর থেকেই তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে সকালে তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
তিনি বলেন, “বিরিয়ানি খাওয়া ব্যক্তিরাই অসুস্থ হয়েছেন। খাবারে কোনো সমস্যা ছিল কি না, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।”
আরেক ভুক্তভোগী জাহিদ হোসেন জানান, আলমডাঙ্গায় ঘুরতে গিয়ে ফেরার সময় তিনি দুই প্যাকেট বিরিয়ানি কিনেছিলেন। বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সেই খাবার খাওয়ার পর তাঁরাও অসুস্থ হয়ে পড়েন। একই খাবার খেয়ে একাধিক ব্যক্তি অসুস্থ হওয়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্ত করা উচিত বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে আলমডাঙ্গার বিভিন্ন বিরিয়ানি হাউজ ও খাবারের দোকানে খাদ্যের মান, সংরক্ষণ পদ্ধতি ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক প্রতিষ্ঠানেই খাবার সংরক্ষণ ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মানা হয় না। একই সঙ্গে নিয়মিত খাদ্য তদারকির ঘাটতিও রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
শুধু তাই নয়, নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, কিছু খাবারের দোকানে খাসির মাংসের নামে তুলনামূলক কমদামি মাদী ছাগলের মাংস পরিবেশনের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ভোক্তারা।
সাইদুল ইসলাম নামে এক মার্কেটিং কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শুধু আলমডাঙ্গা শহরের মধ্যেই নয়, পাশের হাটবোয়ালিয়ার হোটেলগুলোর অবস্থা দেখলেও মনে হয় জেলায় ভোক্তা অধিকার বলতে কিছু নেই। একটা ঘটনা ঘটবে, মানুষ অসুস্থ হবে, তারপর প্রশাসনের টনক নড়বে—আগে থেকে কোনো কার্যকর তদারকি থাকে না। যেখানে মাছি, আবর্জনা,পঁচা দুর্গন্ধ যুক্ত খাবার প্রতিনিয়তই বিক্রি করেছে হোটেলগুলো।
এদিকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ফারহানা ওয়াহিদ তানি বলেন, “আলমডাঙ্গা থেকে শিশুসহ ৯ জন বমি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিরিয়ানি খাওয়ার পরই তাঁদের অসুস্থতা শুরু হয়েছে।”
সাধারণ মানুষ মনে করেন একই খাবার খাওয়ার পর একাধিক মানুষের অসুস্থ হওয়ার অভিযোগকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। খাবারে জীবাণু, বাসি বা নষ্ট উপকরণ ব্যবহার, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ কিংবা খাদ্য সংরক্ষণে অনিয়ম—কোন কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে, তা দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষার দাবি উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগটি সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি শহরের হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে খাবারের মান, রান্নাঘরের পরিবেশ, খাদ্য সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়মিতভাবে তদারকি করা জরুরি। জনস্বাস্থ্যের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো ধরনের গাফিলতি থাকলে তা ভোক্তাদের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভোরের আকাশ/ এনউব