ঈশ্বরদী বহরপুর আশ্রয়ন প্রকল্পের শতাধিক ঘরে থাকছেনা বরাদ্দ প্রাপ্তরা

ঈশ্বরদীর বহরপুর আশ্রয়ন প্রকল্পের গৃহহীনদের জন্য প্রাপ্ত ২০৬টি নতুন বাড়ির প্রায় শতাধিক ঘরে বসবাস করেন না ঘরের মালিকেরা। প্রাপ্ত একই বাড়ি বিক্রি হচ্ছে একাধিকবার। সোমবার(০৬ এপ্রিল) সাকালে বহরপুর আশ্রয়ন প্রকল্পে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় প্রায় শতাধিক ঘর ক্রয় বিক্রয় হয়েছে এবং এমনও ঘর আছে যে ঘর দুই থেকে তিনবার বিক্রি হয়েছে। আর এই ঘর গুলো বিক্রি হয়েছে ৫০ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত। ঘর কেনা বেচার এই টাকার অর্ধেক দিতে হয় স্হানীয় আশ্রয়ন প্রকল্পের নেতাদের।
সাথে বিক্রয়কারীদের হাতে তুলে দিচ্ছে ঘরের দলিল এবং ষ্ট্যাম্পে লিখিত আকারেও লিখে দিচ্ছে। বিনামূল্যে পাওয়া সরকার কর্তৃক প্রদান করা এসব বাড়ির কয়েকটি ঘর তালাবদ্ধ অবস্হায়ও দেখা যায় অথবা শতাধিক ঘরে বসবাস করছে অন্য কেউ। পলি খাতুন নামে একজন আশ্রয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ প্রাপ্তদের কাছ থেকে তিনটি ঘর ক্রয় করেছে। সরকারের তরফ থেকে বিনামূল্যে নতুন ঘর পাওয়া সুমন আহাম্মেদ, আমেনা পাগলি, সাথী খাতুন, জালাল এমন শতাধিক গৃহহীনেরা তাদের ঘর বিক্রি করে দিয়েছে।
ঘর ক্রয় বিক্রয়ের জন্য স্হানীয় নেতাদেরকেও চাঁদা দিতে হয়। আবার চায়না খাতুন, কামাল হোসেন নামে এরা ঘর ক্রয় করে বহরপুর আশ্রয়ন প্রকল্পে বসবাস শুরু করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রঙ মিস্ত্রি শ্রমিক বলেন আমি এটা আমার চাচার ঘর এখন আমি থাকি।আরেকজন সেলুন দোকানদার বলেন আমি কয়েকদিন আগে একজনের কাছ থেকে ঘর কিনেছি। ঝর্না খাতুন নামে বরাদ্দপ্রাপ্ত তিনি তার পাওয়া ঘর ভাড়া দিয়েছেন।সেই ভাড়াটিয়া আবার আরেকজনের কাছে ভাড়া দিয়েছে। এভাবেই অল্প টাকায় বিক্রয় করে একে একে ফিরে যাচ্ছেন তাদের আগের ঠিকানায় বা অন্য জায়গায়। এদের অনেকে নতুন বাড়ি ফেলে শহরে কিংবা গ্রামে তাদের সুবিধামত এলাকায় গিয়ে বাড়ি ভাড়া করে বসবাস করছেন। আশ্রয়ন প্রকল্পের অধীনে গৃহহীনদের জন্য তৈরি করা এসব নতুন বাড়িগুলো অনেকের জন্য এখন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্নমানের নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে এসব বাড়িতে বসবাস করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন বাসিন্দারা।
কোথাও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই, কোথাও আবার পরিবেশ বাসযোগ্য নয়। অনেকেই বাধ্য হয়ে নতুন ঘর ছেড়ে আগের জায়গায় ফিরে যাচ্ছেন। ফলে বিগত সরকারের এই উদ্যোগের সুফল পুরোপুরি পাচ্ছেন না উপকারভোগীরা।কোনো বাড়ি যাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তাদের বদলে বসবাস করছেন অন্য লোক। আবার সে সময় অনেকে ক্ষমতার জোরে একই পরিবারের তিন চারজন পেয়েছেন এসব নতুন ঘর। এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে শতাধিক বাড়িতে বাস করছেন অন্য মানুষ অথবা তালাবদ্ধ ঘরে বসবাস করছেন না কেউ । অনেক বাড়ি-ঘর এখন পরিত্যক্ত পড়ে আছে। বসবাস না করার কারণে এসব নতুন ঘরবাড়ি ইতোমধ্যে নষ্ট হতে চলেছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের এসব বাড়ি বসবাস করার উপযোগী নয় বলে অভিযোগ করেন কয়েকজন বাসিন্দা। তারা বলেন, এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে নেশাখোর ও বখাটেদের উপদ্রবের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত চোরের উপদ্রবে ভিক্ষা-ভাতাভোগীরা তাদের ভিক্ষার চাল হারিয়ে আর ফিরে পাননি। ফলে উপার্জনের শেষ সম্বল হারিয়ে অনেকে নতুন বাড়ি ফেলে চলে গেছেন। শহর থেকে দূরে হওয়ায় কিংবা অন্য এলাকা থেকে এসে এখানে বসবাস করতে গিয়ে কাজ হারিয়েছেন অনেকে। নতুন জায়গায় এসে নতুন কাজ সংগ্রহ করতে কিংবা খাপ খাওয়াতে পারছেন না অনেকে। অনেকে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত জনদের নিকট টাকার বিনিময়ে তাদের নামে বরাদ্দকৃত ঘর ভাড়া দিয়ে থাকছেন অন্য জায়গায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আশ্রয়ন প্রকল্পের এক বাসিন্দা জানান একই ঘরগুলো দুই তিনবার বদল হয়ে বিক্রি হচ্ছে এবং ঘরের প্রকৃত মালিক থাকে না। এখানে প্রায় শতাধিক জনের মত ভাড়াটিয়া রয়েছেন যারা অন্যের ঘর ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন।
রোকেয়া বেগম নামে একজন ভাড়াটিয়া বলেন, বরাদ্দকৃত এই ঘরের মালিক অজেদ কোর। তিনি আমার আত্মীয় তাই আমাকে এখানে বসবাস করতে দিয়ে তিনি অন্যত্র বসবাস করেন। অরিফা বেগম নামে আরেকজন বরাদ্দকৃত ঘরের মালিক বলেন, আমার ঘরের দেয়াল আলগা। ঘর দিয়ে পানি পড়ে, এখানে বসবাস করার কোনো উপায় না থাকায় ঘর ছেড়ে চলে এসেছি। সমসের আলী নামে আরেকজন বরাদ্দকৃত ঘরের মালিক বলেন, আমি যেখানে কাজ করি সেখান থেকে এখানে যাওয়া আসা করতে সমস্যা হয়, তাই আমার ঘরে আমি না থেকে আমার আত্মীয়কে থাকতে দিয়েছি। এ প্রকল্পে শতাধিক বাড়িতে বসবাসকারীরা নিজেদের এখানে ভাড়াটিয়া স্বীকার করতে চায় না। পরে কাগজ ও দলিল দেখতে চাইলে তারা দলিল দেখাতে না পেরে স্বীকার করেন যে তারা এসব ঘরের প্রকৃত মালিক নন। বহরপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের স্থানীয় নেতা শফিকুল ইসলাম বলেন, যারা বরাদ্দকৃত ঘরের প্রকৃত মালিক তারা ভাড়া দিয়ে অন্য জায়গায় চলে গেছে।
পপিয়া বেগম নামের এক বাসিন্দা জানান, প্রথম প্রথম সবাই নতুন বাড়িতে বসবাস শুরু করলেও এখন অর্ধেকের বেশি নতুন বাড়ি তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে আছে। এসব তালাবদ্ধ বাড়িতে আর কেউ বসবাস করছেন না। আশ্রয়ণ প্রকল্পের নতুন বাড়ির বাসিন্দা আনোয়ারা খাতুন বলেন, বাড়ি আছে কিন্তু উঠান নেই, এখানে গবাদি পশু পালন করার ব্যবস্থা নেই ফলে গরু বঁধতে ঘুমানোর জন্য তো আর এখানে বসবাস করা যায় না। শারীরিক প্রতিবন্ধী আলমগীর হোসেন নতুন বাড়ি পেয়েও বাড়ি ফেলে বসবাস করেন রেললাইনের পাশের বস্তির বাড়িতে। তিনি বলেন, নতুন বাড়ি পেয়ে খুশি হয়েছিলাম কিন্তু সেখানে গিয়ে কোনো কাজ করতে না পেরে ফিরে এসেছি আগের ঠিকানায়। নজমুন্নাহার বেগম নামের এক বৃদ্ধা বহরপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে বাড়ি পেলেও তিনি বসবাস করেন অন্যের বাড়িতে। তিনি বলেন, আমার নামে বরাদ্দ নতুন বাড়িতে অন্যজনকে থাকতে দিয়েছি। আকরাম মোল্লা জানান, নতুন বাড়িতে থাকতে না পেরে ঘর ফেলে রেখে ফিরে এসেছি আগের ঠিকানায়। লক্ষ্মীরাণী নামের আরেক নারী বলেন মাদকাসক্তদের অত্যাচারে আশ্রয়ণ প্রকল্পের নতুন বাড়ি ফেলে বস্তিতে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছি।
গত কয়েকদিনে একাধিকবার বহরপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব বাড়িতে রান্নার আলাদা ব্যবস্থা নেই, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও অপ্রতুল। বসবাসের জন্য নিরাপত্তা অভাবও রয়েছে বলে জানান।এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সেহাব উদ্দিন সরকার বলেন আপনারা বললেন আমরা এর প্রতিবেদন এসিল্যান্ড স্যারের কাছে জমা দিবো। এবং স্যার তাদের নাম বাতিল করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
ভোরের আকাশ/এনউব