ভ্যান হারিয়ে অসহায় আসাদুল, প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে অপেক্ষা

বাড়িতে খাবার নেই। নেই আয়ের কোনো পথও। একমাত্র উপার্জনের অবলম্বন পাখি ভ্যানটি চুরি হয়ে যাওয়ার পর অসহায় হয়ে পড়েছেন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার বেলগাছি গ্রামের আসাদুল হক। চুরি যাওয়া ভ্যানটির আশায় এখনো মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তিনি। আর বাড়িতে প্রতিবন্ধী ছেলে জীবনকে পাশে নিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করেন, এই বুঝি কেউ তাঁর হারিয়ে যাওয়া ভ্যানটি ফিরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
আসাদুলের সংসারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। এক ছেলে প্রতিবন্ধী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। সারাদিন ভ্যান চালিয়ে যে আয় হতো, তা দিয়েই চলত পাঁচ সদস্যের সংসার। সেই ভ্যানটি হারিয়ে এখন খাবারের জোগান দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, করোনাকালে আসাদুলের অসহায়ত্ব দেখে আলমডাঙ্গার কয়েকজন তরুণ তাঁকে একটি পাখি ভ্যান উপহার দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, ভ্যান চালিয়ে যেন তিনি নিজের ও পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন এবং ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভর করতে না হয়। সেই ভ্যানটিই হয়ে উঠেছিল তাঁর পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস।
আসাদুল হক জানান, গত ১৩ সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বেলগাছি গ্রাম থেকে দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে তাঁর ভ্যানটি নিয়ে যায়। দিনের বেলায় ঘটনাটি ঘটলেও তাৎক্ষণিকভাবে ভ্যানটির কোনো সন্ধান পাননি তিনি। পরে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও ভ্যানটির সন্ধান না পেয়ে পরদিন আলমডাঙ্গা থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন।অভিযোগের সাত দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো ভ্যানটির সন্ধান মেলেনি। ভ্যানটি ফিরে পাওয়ার আশা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে এলেও অপেক্ষা থামেনি আসাদুলের ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন ।
বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নির্দেশে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের পক্ষ থেকে অসহায় পরিবারটির জন্য শুকনা খাবার ও নগদ ৩ হাজার টাকা দেওয়া হয়। তবে সেই সহায়তাও শেষ হয়ে গেছে। ফলে আবারও খাবার ও জীবিকার সংকটে পড়েছে পরিবারটি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আসাদুল হক বলেন, সারাদিন ভ্যান চালিয়ে যা আয় করতাম, তা দিয়েই সংসার চলত। আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। এক ছেলে প্রতিবন্ধী, তার নাম জীবন। সংসারে আমি একমাত্র উপার্জনকারী। ভ্যানটিই ছিল আমার একমাত্র সম্বল। সেটিও চুরি হয়ে গেল।
তিনি বলেন, এখন বাড়িতে খাবার নেই। কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না। সারাক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকি, এই বুঝি আমার ভ্যানটা কেউ ফিরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন আলমডাঙ্গা শাখার সভাপতি আল আমিন হোসেন পরশ বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আসাদুল হকের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস পাখি ভ্যানটি চুরি হয়ে যাওয়ায় পরিবারটি বর্তমানে চরম অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছে। বিশেষ করে পরিবারের এক সদস্য প্রতিবন্ধী হওয়ায় তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মানবিক দিক বিবেচনা করে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আসাদুল হককে একটি নতুন পাখি ভ্যান দেওয়া হলে পরিবারটির জীবিকার পথ আবারও সচল হবে এবং তাদের মুখে হাসি ফিরবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আসাদুলের চুরি যাওয়া ভ্যানটি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি অসহায় পরিবারটির পাশে সামর্থ্যবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসবে। ভ্যানটি ফিরে পেলে কিংবা জীবিকার একটি ব্যবস্থা হলে প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ পাবেন আসাদুল।
ভোরের আকাশ/আ.র