বোয়ালমারীতে সরকারি ভবন বিক্রি ও অর্থ অনিয়মের অভিযোগ

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার রাখালতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক কক্ষবিশিষ্ট পুরোনো লাইব্রেরি ভবন নিলাম ছাড়াই বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে। তবে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা সারমিন জাহান দাবি করেছেন, রেজুলেশনের মাধ্যমে ভবনটি বিক্রি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদ্যালয়ের মেরামতের জন্য বরাদ্দ পাওয়া ২ লাখ টাকার ব্যয়ের কোনো ভাউচার নেই বলেও জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষিকা। তাঁর দাবি, রেজুলেশনের মাধ্যমে এসব অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। তবে একটি ভাউচারে ৫২ হাজার ৭০৫ টাকার মালামাল কেনার তথ্য পাওয়া গেলেও রেজুলেশনে ওই কেনাকাটার ব্যয় দেখানো হয়েছে ৭২ হাজার ৫০০ টাকা।
বিদ্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল শিক্ষকদের লাইব্রেরি হিসেবে ব্যবহৃত টিনশেডের একটি কক্ষ নিলাম ছাড়াই রেজুলেশনের মাধ্যমে ১৯ হাজার ১৫০ টাকায় বিক্রি করা হয়। একই সঙ্গে ওই কক্ষ ভাঙার শ্রমিক খরচ হিসেবে ১২ হাজার ৭৫০ টাকা দেখানো হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ওই কক্ষে প্রায় ১১ থেকে ১২ হাজার ইট ব্যবহার করা হয়েছিল। এ ছাড়া এতে লোহার অ্যাঙ্গেল ও টিন ছিল। তাঁদের মতে, সে সময় ভবনটির বাজারমূল্য ছিল লক্ষাধিক টাকা।
অন্যদিকে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদ্যালয়টির মেরামতের জন্য সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয় ২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ভ্যাট বাবদ টাকা বাদ দিয়ে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা উত্তোলন করেন প্রধান শিক্ষিকা।
বিদ্যালয়ের নথি অনুযায়ী, বোয়ালমারী বাজারের মেসার্স কুন্ডু স্টোর থেকে ২০২৪ সালের ২০ মার্চ রংসহ বিভিন্ন মালামাল কেনা হয়। ভাউচারে এসব পণ্যের মূল্য ৫২ হাজার ৭০৫ টাকা উল্লেখ থাকলেও রেজুলেশনে কেনাকাটার ব্যয় দেখানো হয়েছে ৭২ হাজার ৫০০ টাকা। এ নিয়ে বিদ্যালয়ের অর্থ ব্যয়ে অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে।
বিদ্যালয়ের পাশের গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা আসমা বেগম (২৭) অভিযোগ করে বলেন, তাঁর ছেলে হুসাইন (৮) ও মেয়ে সোহনা (৬) এই বিদ্যালয়ে পড়ত। দুষ্টুমি করার কারণে প্রধান শিক্ষিকা তাঁদের কাছে অভিযোগ করতেন এবং সন্তানদের স্কুল থেকে নিয়ে যেতে বলতেন। পরে বাধ্য হয়ে গত বছর সন্তান দুটিকে স্কুল থেকে নিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি করেন তিনি। মাদ্রাসা থেকে ফেরার পথে রাস্তার পাশে থাকা গাছের গুঁড়ির আঘাতে তাঁর ছেলে হুসাইন মারা যায়।
আসমা বেগম আরও বলেন, চলতি বছরের প্রথম দিকে মেয়েকে আবার বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে গেলে প্রধান শিক্ষিকা তাঁকে বলেন, গুচ্ছগ্রামের শিশুদের এই স্কুলে ভর্তি করা যাবে না। ভর্তি করলেও তারা বই ও খাবার পাবে না। এরপর থেকে তাঁর মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ রয়েছে।
গুচ্ছগ্রামের আরেক বাসিন্দা রিক্তা বেগম (২৫) বলেন, তাঁর ছেলে আজিম মোল্যাকে (৮) বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে গেলে প্রধান শিক্ষিকা বলেন, গুচ্ছগ্রামের কোনো শিশুকে এই বিদ্যালয়ে ভর্তি করা যাবে না। পরে তিনি তাঁর সন্তানকে পাশের আলফাডাঙ্গা উপজেলার বারাংকুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন।
বিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী শিক্ষক আবুল বাশার এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও দুই সহকারী শিক্ষক অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষিকা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। তাঁদের দাবি, শিশু শ্রেণিতে কোনো শিশু ভর্তি হতে এলে তাকে বলা হয়, ভর্তি হলে বই ও খাবার পাওয়া যাবে না। এ কারণে শিশু শ্রেণিতে বর্তমানে মাত্র ছয়জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষকদের মানসিকভাবে হয়রানি করা হয় বলেও তাঁরা অভিযোগ করেন।
অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা সারমিন জাহান বলেন, বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনটির জন্য কোনো টেন্ডার দেওয়া হয়নি। ২০১৮ সালে রেজুলেশনের মাধ্যমে ১৯ হাজার ১৫০ টাকায় ভবনটি বিক্রি করা হয়েছিল।
নিলাম ছাড়া সরকারি ভবন কীভাবে বিক্রি করা হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের চারপাশে বাউন্ডারি নির্মাণের কাজ চলছিল। এ কারণে তাড়াহুড়া করে রেজুলেশনের মাধ্যমে ভবনটি বিক্রি করা হয়।
মেরামতের জন্য বরাদ্দ পাওয়া ২ লাখ টাকার বিষয়ে প্রধান শিক্ষিকা বলেন, ভ্যাট বাদ দিয়ে তিনি ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পেয়েছেন। এর মধ্যে উপজেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, মেরামতের জন্য বরাদ্দ পাওয়া টাকা থেকে প্রতিটি স্কুলকেই শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার টাকা দিতে হয়।
তিনি আরও বলেন, রং, বালু, সিমেন্ট, টাইলস ও শ্রমিকের খরচসহ ব্যয় করার পর আরও প্রায় ৫ হাজার টাকা দেনা হয়েছে। পরবর্তী বরাদ্দ থেকে ওই টাকা সমন্বয় করা হয়েছে।
মালামাল ও শ্রমিকের খরচের ভাউচার সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষিকা বলেন, এসব খরচের কোনো ভাউচার নেই। রেজুলেশন খাতায় ব্যয়ের হিসাব লেখা হয়েছে এবং ওই রেজুলেশন খাতার ফটোকপি শিক্ষা অফিসে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে ভর্তি ও শিক্ষকদের হয়রানিসহ অন্যান্য অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
বোয়ালমারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, নিলাম ছাড়া ভবন বিক্রি এবং বরাদ্দ পাওয়া ২ লাখ টাকার হিসাবে অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ তিনি শুনেছেন। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বরাদ্দের টাকা থেকে শিক্ষা অফিসে অর্থ দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই বলেও জানান তিনি। শিশু শ্রেণিতে ভর্তির বিষয়টিও তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম রকিবুল হাসান বলেন, নিলাম ছাড়া ভবন বিক্রি এবং মেরামতের জন্য বরাদ্দ পাওয়া অর্থের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভোরের আকাশ/সু.পা