সীতাকুণ্ডে বিলুপ্তির পথে সবুজ প্রকৃতির অপরিহার্য প্রাণী বাদুড়

বাদুড়কে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিকর কিংবা ভীতিকর প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করলেও গবেষকেরা বলছেন ভিন্ন কথা। গবেষকেরা দাবী বাদুড়ের ক্ষতি যৎসামান্য, সে লনায় নিরীহ প্রাণীটির উপকারিতার পরিমাণ বহুগুণ।
বাদুড়ের নানা উপকারিতা, গবেষণা কিংবা ক্ষতিকর দিক সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচার করে সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যেই এ দিবসটির সূচনা করেছে আন্তর্জাতিক বাদুড় গবেষণা সংস্থা ‘ব্যাট কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনাল‘। গবেষণা বলছে, বাদুড় যেসব কীটপতঙ্গ শিকার করে, তার ৬০ শতাংশ ফসলের জন্য ক্ষতিকর। তাতে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে।
সাধারণ অবস্থায় একটি বাদুড় নানা প্রজাতির মশা‘সহ প্রতি রাতে তার দেহের ওজনের অর্ধেক পরিমাণ পোকামাকড় শিকার করে। বর্ষার সন্ধ্যাবেলায় আকাশে তাকালে দেখা যায়, অসংখ্য ছোট প্রাণী দিগ্বিদিক উড়ে বেড়াচ্ছে। অনেকে এগুলোকে পাখি ভেবে ভূল করেন। এরা আসলে বাদুড় বা চামচিকা। সন্ধ্যা নামলে ভূমিতল, ফসলের ক্ষেত ও গাছপালা থেকে নানা কীটপতঙ্গ, মশা-মাছি বেরিয়ে পড়ে।
ঠিক সেই সময় বাদুড়ও বেরিয়ে পড়ে রাতের খাবার সংগ্রহে শিকার কাজে। সীতাকুণ্ড পৌরসদর ব্যবসায়ী দোকান মালিক সমিতির সহ-সভাপতি নুর মোহাম্মদ বলেন, মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে পরাগায়নকারী পাখি, প্রজাপতি, মৌমাছি, বাদুড় প্রভৃতি প্রাণীর রয়েছে অপরিহার্যতা। এগুলোর মাধ্যমে প্রকৃতির ইকোসিস্টেমের সেবা কার্যকর ভাবে অব্যাহত থাকে।
এসব প্রাণী না থাকলে স্থলজ ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়বে, অস্তিত্ব মহাসংকটে পড়বে আমাদের প্রকৃতি। তবে একথা সত্য যে, বর্তমানে এয়াকুবনগর পাহাড়ি এলাকাসহ সীতাকুণ্ডে বাদুড়ের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। এক সময় আমাদের গ্রামসহ উপজেলা জুড়ে তেঁতুলগাছ, বটগাছ কিংবা বড় আকারের কোনো গাছে বাদুড় দল বেঁধে ঝুলে থাকতো। সেই বাদুড় আর আগের মতো চোখে পড়ে না।
আবাসস্থল ধ্বংস, বৃহদাকার গাছ কেটে ফেলা, বাদুড় শিকার‘সহ নানা কারণে প্রতিনিয়ত কমছে নিরীহ প্রাণীটির সংখ্যা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এস. এম সাইফুল আলম বলেন, বাদুড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে খুবই নিরীহ তবে যথেষ্ট উপকারী বটে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে তো বাদুড় নিয়ে আছে নানা ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার। অনেকে নিরীহ এ প্রাণীটিকে অমঙ্গলের প্রতীক বলেও মনে করে।
আবার অনেকের কাছে বাদুড় নানা ধরনের প্রাণঘাতী জীবাণুবাহক হিসেবে পরিচিত। প্রকৃতি জগতের নানা প্রাণী যেমন কুকুর, বিড়াল কিংবা বানর নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের যেমন বাহক, তেমনি বাদুড়ও বিভিন্ন প্রকার জীবাণু বহন করে। এতে অন্যান্য প্রাণীর মতো বাদুড়েরও কিছু ক্ষতিকর দিক থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। যেমন কলাবাদুড় নিপাহ ভাইরাস বহন করে।
যা খেজুরের কাঁচা রসের মাধ্যমে মানুষের দেহেও ছড়াতে পারে। বাদুড় ভালোবাসা দিবসে কেন প্রাণীটিকে এত গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেটির পেছনে রয়েছে নানা কারণ। বাদুড় যেসব ইকোসিস্টেম সার্ভিস প্রদান করে, তার মধ্যে অন্যতম পেস্ট কন্ট্রোল, উদ্ভিদের পরাগায়ন ও বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে উদ্ভিদের বীজ ছড়িয়ে দেওয়া।
গবেষকদের মতে আম, পেয়ারা কিংবা কলা‘সহ ৩ শতাধিক প্রজাতির উদ্ভিদের পরাগায়ণ ফলভোজী বাদুড়ের মাধ্যমে ঘটে থাকে। পৃথিবীর ১ হাজার ৪শত প্রজাতির খাদ্য উৎপাদনকারী উদ্ভিদ আছে, তার প্রায় ৮০ শতাংশের পরাগায়নের জন্য নানা ধরনের পরাগায়নকারী প্রাণীর উপস্থিতি একান্ত অপরিহার্য। তম্মর্ধে নীরবে কাজ করে চলেছে নানা জাতের বাদুড়‘সহ অন্যান্য প্রাণী।
ভোরের আকাশ/ র.ই