ভারতের মাটিতে সমাধি আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি স্বজনদের

স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তিনি। যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেছেন, শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনে শহিদ হয়েছেন।
অথচ যে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য তাঁর এই আত্মত্যাগ, সেই দেশের মাটিতেই আজও ঠাঁই হয়নি তাঁর শেষ ঠিকানার। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও শহিদ বুদ্ধিজীবী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কুড়িগ্রামের কৃতি সন্তান অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের সমাধি পড়ে আছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার একটি সীমান্তবর্তী এলাকায়, অযত্ন-অবহেলায়।
নদীভাঙনের হুমকিতে থাকা সেই সমাধিকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে যথাযোগ্য মর্যাদায় পুনঃসমাহিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁর স্বজন, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসী।
গতকাল ৭ আগস্ট অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। দিবসটি উপলক্ষে ভূরুঙ্গামারী উপজেলার জয়মনিরহাট ইউনিয়নে নানা কর্মসূচি পালিত হলেও তাঁর সমাধি দেশে ফিরিয়ে আনার দীর্ঘদিনের দাবি আবারও জোরালো হয়ে উঠেছে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধের ৬ নম্বর সেক্টরের অধীনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার বামনহাটে স্থাপিত যুব শিবিরে ক্যাম্প ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সীমান্ত এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সমন্বয় এবং যুদ্ধের বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন তিনি।
১৯৭১ সালের ৭ আগস্ট ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিংঝাড় এলাকায় তৎকালীন বগনী রেলসেতুর কাছে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে অবস্থানকালে রাজাকারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানি বাহিনী অতর্কিত হামলা চালায়। ব্রাশফায়ারে গুরুতর আহত হন অধ্যাপক ওয়াহাব তালুকদার। পরে পাকিস্তানি সেনারা সীমান্ত অতিক্রম করে তাঁকে আটক করে। তাঁর কাছে মুক্তিযুদ্ধ-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পাওয়ার পর বেয়নেট দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।
সেই সময় সীমান্ত এলাকায় তীব্র গোলাবর্ষণ ও মর্টার হামলার কারণে তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে এনে দাফন করা সম্ভব হয়নি। পরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার বামনহাট সীমান্তসংলগ্ন ফুলকুমার নদের তীরের কালমাটি মসজিদ চত্বরে তাঁকে দাফন করা হয়। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও সেই সমাধিই রয়ে গেছে ভারতের মাটিতে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীভাঙন ও সংরক্ষণের অভাবে সমাধিটি এখন অস্তিত্ব সংকটে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে এটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা জানান, বিভিন্ন সময়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সমাধি বাংলাদেশে স্থানান্তরের আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
শহিদ অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের পুত্র মিজান তালুকদার বলেন, “আমার বাবা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। অথচ তাঁর কবর আজও বিদেশের মাটিতে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে জন্মভূমিতে ফিরিয়ে এনে পুনঃসমাহিত করা হলে সেটিই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত সম্মান।”
জয়মনিরহাট ইউনিয়নের আরেক কৃতি সন্তান ও চীনপ্রবাসী ড. রোকনুজ্জামান কিরণ বলেন, “বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার বাঙালি জাতির গর্ব। প্রতিবছর রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে স্মরণ করা হলেও তাঁর সমাধি আজও ভারতের মাটিতে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। সংরক্ষণের অভাবে সেটি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে, অথচ স্বজনরাও সেখানে গিয়ে যথাযথভাবে শ্রদ্ধা জানাতে পারেন না। এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।”
জয়মনিরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াদুদ সরকার বলেন, “এটি শুধু একটি পরিবারের দাবি নয়, পুরো এলাকার মানুষের প্রত্যাশা। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ বুদ্ধিজীবীর সমাধি বিদেশের মাটিতে অবহেলায় পড়ে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাঁর সমাধি বাংলাদেশে এনে সংরক্ষণ এবং স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা প্রয়োজন।”
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকদের মতে, অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে তাঁর স্মৃতি রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি। তাঁদের দাবি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ভারত সরকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাঁর সমাধি বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হোক।
৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকীতে ভূরুঙ্গামারীর মানুষের একটাই প্রত্যাশা, যে মানুষটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর হলেও তাঁর শেষ ঠিকানা যেন ফিরে আসে নিজের জন্মভূমির মাটিতে। সেটিই হবে জাতির পক্ষ থেকে এই শহিদ বুদ্ধিজীবীর প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা ও সম্মান।
ভোরের আকাশ/রই