খাল পুনঃখনন ও আধুনিক সেচে বদলে যাচ্ছে সিলেটের কৃষি

হাওর, নদী, খাল ও পাহাড়ি ছড়ায় সমৃদ্ধ সিলেট অঞ্চলে কৃষির সম্ভাবনা থাকলেও সেচের অভাবে বছরের পর বছর অনাবাদি পড়ে থাকে বিপুল পরিমাণ জমি। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট আর বর্ষায় পাহাড়ি ঢল, জলাবদ্ধতা ও আগাম বন্যার ঝুঁকি কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় খাল ও পাহাড়ি ছড়া পুনঃখনন, আধুনিক সেচযন্ত্র স্থাপন এবং ভূ-উপরিস্থ পানির পরিকল্পিত ব্যবহারে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর ফলে একদিকে অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আসছে, অন্যদিকে জলাবদ্ধতা নিরসন ও আগাম বন্যায় ফসলের ক্ষতি কমানোর পথ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বাস্তবায়নাধীন ‘সিলেট বিভাগে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি’ প্রকল্পের আওতায় এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রকল্পের মাধ্যমে খাল, নালা ও পাহাড়ি ছড়া পুনঃখনন ও সংস্কার করে বর্ষার পানি সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, আধুনিক সেচযন্ত্র স্থাপন, ভূগর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় সেচ অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে কৃষকের জমিতে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সেচের পানির অপচয় কমিয়ে দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৪৫ কিলোমিটার খাল ও পাহাড়ি ছড়া পুনঃখনন ও সংস্কার এবং ১৮টি সেচ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ১ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে সম্পূরক সেচ দেওয়া এবং ৪ হাজার ২৮০ হেক্টর জমির জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব হয়েছে।
খাল পুনঃখননের ফলে নাব্যতা বাড়ায় নৌচলাচলও স্বাভাবিক হচ্ছে। এতে হাওর এলাকার কৃষকরা সহজে নৌকায় ফসল পরিবহন করতে পারছেন। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা দ্রুত নিষ্কাশনের মাধ্যমে আগাম বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা এবং মৎস্য অভয়ারণ্য তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
এ ছাড়া ৬৯টি সেচযন্ত্র সরবরাহ এবং ২৭৭ দশমিক ৬ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ সেচনালা বা ব্যারিড পাইপলাইন নির্মাণের মাধ্যমে ২ হাজার ৯৫৫ হেক্টর অনাবাদি জমিতে সেচের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে সেচের পানির অপচয় কমার পাশাপাশি সেচের দক্ষতা বেড়েছে এবং কৃষকের উৎপাদন খরচ কমেছে।
অন্যদিকে, ৮ কিলোমিটার গোপাট নির্মাণের ফলে ৪ হাজার ৫০ হেক্টর জমির বোরো ধান দ্রুত কেটে ঘরে তুলতে পারছেন কৃষকরা। এতে আগাম বন্যার হাত থেকে ৫ হাজার ৪০০ কৃষকের ফসল রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি ২৭০ জন কৃষক ও পাম্প অপারেটরকে সেচযন্ত্র পরিচালনা, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও সেচের দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী প্রণজিত কুমার দেব বলেন, সিলেট বিভাগের অনাবাদি ও পতিত জমি চাষের আওতায় আনতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ১৭ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ধাপে ধাপে বাকি জমিগুলোও সেচের আওতায় আনা হবে।
তিনি আরও বলেন, খাল খনন ও সেচ অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সৌরশক্তিচালিত সেচপাম্প স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, পানির পরিকল্পিত ব্যবহারের মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলের অনাবাদি জমি ধীরে ধীরে ফসলি জমিতে পরিণত হবে। হাওর ও পাহাড়ি জনপদে আধুনিক সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে সিলেটের বাড়তি কৃষি উৎপাদন দেশের খাদ্যনিরাপত্তা জোরদারেও সহায়ক হবে।
ভোরের আকাশ/সু.পা