নবজাতকের মৃত্যু
সাজিনাস হাসপাতালের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ, তদন্তের দাবি

জন্মের মাত্র কয়েক দিনের মাথায় থেমে গেল একটি নবজাতকের জীবন। শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ার সঙ্গে লড়াই করে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছিল শিশুটি।
কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার বাম হাতে জটিলতা দেখা দেয়। পরিবারের অভিযোগ, সেই জটিলতা একপর্যায়ে গ্যাংগ্রিনে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারাতে হয় নবজাতককে।
ঘটনাটি সামনে আসে শিশুটির মা আমাতুল মাকনুনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ ফেইজবুক পোস্টের মাধ্যমে। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, চট্টগ্রামের সাজিনাস হাসপাতাল লিমিটেডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অবহেলা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কারণে তার সন্তানের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং পরবর্তীতে মৃত্যু হয়।
মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৫ মে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে তার পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। জন্মের সময় অক্সিজেন সংকট ও নিউমোনিয়ার কারণে তাকে লাইফ সাপোর্টে রেখে সাজিনাস হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফয়সাল আহমেদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শুরু হয়।
তিনি দাবি করেন, কয়েক দিনের চিকিৎসার পর শিশুটির অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল এবং তাকে এনআইসিইউ থেকে কেবিনে স্থানান্তরের প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যেই শিশুটির বাম হাতে ব্যান্ডেজ দেখতে পান তিনি। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে প্রথমে তাকে আশ্বস্ত করা হলেও পরদিন সন্তানের হাতের কয়েকটি আঙুল কালচে হয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
আমাতুল মাকনুনের অভিযোগ, প্রথমদিকে সমস্যাটিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পরে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হলেও অবস্থার অবনতি থামেনি। একপর্যায়ে শিশুটিকে ঢাকায় নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা দেখতে পান, গ্যাংগ্রিন হাতের কবজি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে বলে পরিবার দাবি করে। একই সঙ্গে সংক্রমণ শরীরের অন্যান্য অংশেও প্রভাব ফেলেছিল বলে তাদের অভিযোগ।
পরিবারের দাবি, জীবন বাঁচাতে শিশুটির আক্রান্ত হাত অপসারণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। কয়েক দিনের ব্যবধানে বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা কমে যায় এবং নিবিড় চিকিৎসা সত্ত্বেও শিশুটির মৃত্যু হয়।
সন্তান হারানোর বেদনা প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে আমাতুল মাকনুন লিখেছেন, সন্তানের হাতে জটিলতা দেখা দেওয়ার পরও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঘাটতি ছিল। তিনি এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে সাজিনাস হাসপাতালের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোন যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি চিকিৎসা-সংক্রান্ত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরাই বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। পরে তিনি হাসপাতালের পক্ষ থেকে একটি লিখিত বক্তব্য পাঠান।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাঠানো লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২৫ মে রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে নবজাতকটি এনআইসিইউতে ভর্তি হয়। সে সময় শিশুটি শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় ভুগছিল এবং বাম হাতের উপরের অংশে উল্লেখযোগ্য ফোলা ছিল।
বক্তব্যে দাবি করা হয়, ভর্তির সময়ই ফোলার বিষয়টি শিশুটির বাবাকে জানানো হয়েছিল এবং চিকিৎসা নথিতেও তা উল্লেখ করা হয়। পরে বাইরের ক্যানোলা অপসারণ করে আক্রান্ত হাত নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। পাশাপাশি হেপারিন জেল, ড্রেসিং, রক্ত সঞ্চালন পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু করা হয়।
হাসপাতালের দাবি অনুযায়ী, ৩০ মে শিশুটির হাতে ফোলা, লালচে ভাব ও রক্ত সঞ্চালনজনিত জটিলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরদিন শিশু সার্জন, ভাসকুলার সার্জন ও শিশু বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে জরুরি পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ১ জুন আক্রান্ত স্থানে চাপ কমাতে এবং রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে ফ্যাসিওটমি করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর হাতের রঙ ও রক্ত সঞ্চালনে কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দেখা যায় বলে হাসপাতালের দাবি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে ঢাকার একটি নির্দিষ্ট বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে পরিবার অন্য হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যার ফলে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে বলে তারা মনে করে।
তাদের ভাষ্য, চিকিৎসার পুরো সময়জুড়ে অভিভাবকদের রোগীর অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে এবং সব সিদ্ধান্তে পরিবারকে সম্পৃক্ত রাখা হয়েছিল।
হাসপাতালের দাবি, চিকিৎসক দল সর্বোচ্চ পেশাগত সতর্কতা, আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে চিকিৎসা প্রদান করেছে এবং চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগের সঙ্গে তারা একমত নয়। তাদের মতে, রোগী হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে সব ধরনের চিকিৎসা সিদ্ধান্ত চিকিৎসা নীতিমালা অনুসরণ করেই নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এ ঘটনায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ তার দপ্তরে জমা পড়েনি। অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী ও সচেতন নাগরিকদের অনেকে।
ভোরের আকাশ/ র.ই