রোহিঙ্গা ক্যাম্পে উৎসাহ-উদ্দীপনায় শারদীয় দুর্গোৎসব

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এবারও বইছে উৎসবের আমেজ। সনাতন ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গাদের একমাত্র উপাসনালয় ‘শ্রী শ্রী শক্তি রাধাকৃষ্ণ মন্দিরে’ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গাপূজা।
গত (১৬ অক্টোবর শুক্রবার) ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে এই পাঁচদিনের ধর্মীয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে, যা এখন আনন্দমুখর পরিবেশে চলমান রয়েছে।
জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে আসা সনাতন ধর্মের প্রায় ৮০টি পরিবার প্রথমে এপারে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে ওই ক্যাম্পটিতে ১৩২টি পরিবারের অন্তত প্রায় ১ হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী বসবাস করছেন। ২০১৮ সাল থেকেই এই জনগোষ্ঠীর মাঝে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দিতে ক্যাম্পের ভেতরেই পূজার আয়োজন হয়ে আসছে।
এবারও একটি অস্থায়ী পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। কুতুপালং ক্যাম্পের পাশাপাশি ক্যাম্পের বাইরে আশ্রয় নেওয়া সনাতন ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গারাও এই দুর্গোৎসবে যোগ দিচ্ছেন।
উখিয়ার কুতুপালং হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি সংলগ্ন পাহাড়ের কোলে নতুন জীবনের সংগ্রাম শুরু হলেও ফেলে আসা ভিটেমাটি আর স্বজন হারানোর বেদনা তাড়িয়ে বেড়ায় এই মানুষগুলোকে। মিয়ানমারে রাখাইনে ঘরবাড়ি, সমাজ ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে আসার সেই ভয়াল স্মৃতি আজও তাদের তাড়া করে ফেরে। অনেকেই জানান, পূজার এই আনন্দঘন সময়েও তাদের মনে পড়ে যায় ওপারে ফেলে আসা পূজামণ্ডপ, আত্মীয়-স্বজন ও পুজোর সেই হারানো দিনগুলোর কথা।
চরম অনিশ্চয়তা আর বন্দিদশার মতো মানবেতর জীবনযাপনের মাঝে এই সনাতন ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গারা প্রতিবছর বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়েই দিন কাটান। ক্যাম্পের বাসিন্দা ও পূজায় অংশ নেওয়া রাখি বালা বলেন, আমাদের জীবন অনিশ্চয়তায় ঘেরা। দেশের বাড়ি, ঘরদুয়ার আর চিরচেনা সেই উৎসবের দিনগুলো পেছনে ফেলে এসেছি। পেটের টানে ও জীবনের নিরাপত্তায় এখানে আশ্রয় নিলেও মন পড়ে থাকে অতীতে। তবে দুর্গাপূজার কয়েকটা দিন মন্দিরের এই আয়োজনে কিছুটা হলেও কষ্টের মাঝে একটু স্বস্তি ও আনন্দের ছোঁয়া পাই।
পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি মোহন বাঁশি পাল বলেন, ক্যাম্পে নানা সংকটের মধ্যেও আমরা ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারছি—এটা আমাদের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি ও আনন্দের। ছোট পরিসরে হলেও প্রতিবছর দুর্গাপূজা উদযাপন করি। এই সময়টুকুই আমাদের জীবনে কিছুটা আনন্দ ও প্রেরণা নিয়ে আসে, যা আমাদের কঠিন বাস্তবতার মাঝেও বেঁচে থাকার শক্তি জোগায়।
উখিয়া উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রুপন দেওয়ানজি বলেন, উখিয়ায় এবছর উপজেলার ৮টি এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ১টিসহ মোট ৯টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সকলের সহযোগিতা ও সম্প্রীতির পরিবেশে পূজার আয়োজন সম্পন্ন করতে আমরা কাজ করছি। উপজেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সকলের সহযোগিতায় পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপিত হবে।
১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক মোহাম্মদ সিরাজ আমীন বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আয়োজিত একমাত্র দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নভাবে উদযাপন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পূজামণ্ডপে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা, টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করার যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, উখিয়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ উপজেলার ৯টি পূজামণ্ডপে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আনসার সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে।
আমরা আশা করছি, সবার সহযোগিতায় এবারের দুর্গাপূজা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন হবে।
ভোরের আকাশ/ এনউব