২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা
আড়তদারদের ‘গোপন ছকে’ রাতেই নদী-সাগরে নামছে শত ট্রলার

মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে নির্ধারিত ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে আজ বুধবার ৭ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে। আইন অনুযায়ী, আজ রাত ১২টা থেকে আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ২২ দিন নদী ও সাগরে সব ধরনের মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ ও ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে সরকার। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে জেল-জরিমানের স্পষ্ট বিধান থাকলেও ভোলার উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রাক্কালে দেখা গেছে সম্পূর্ণ বিপরীত ও উদ্বেগের চিত্র।
মহাজনের দাদনের দায়ে জিম্মি থাকা শত শত জেলেকে প্রলোভন ও চাপে ফেলে নিষেধাজ্ঞার পুরোটা সময় গোপনে মা ইলিশ শিকার করানোর সর্বাত্মক প্রস্তুতি সেরে রেখেছে স্থানীয় প্রভাবশালী আড়তদার ও অসাধু দাদনদারদের একটি শক্তিশালী চক্র।
উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চরফ্যাশন উপজেলায় প্রায় ৯০ হাজার জেলে রয়েছেন। এদের মধ্যে সরকারি নিবন্ধিত ৪৪ হাজার ২৮১ জন এবং অনিবন্ধিত প্রায় ৪৬ হাজার। এছাড়া সমুদ্রগামী নিবন্ধিত ট্রলার রয়েছে ১ হাজার ৩৬৫টি।
অনুসন্ধানে ও গোপন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে গহীন নদী ও সাগরে ট্রলার সচল রাখার জন্য ইতোমধ্যে ঘাটে ঘাটে নেওয়া হয়েছে সুনির্দিষ্ট কৌশল। শুধু ঘাট থেকেই বরফ তুলে ট্রলার পাঠানো হচ্ছে না, বরফ সরবরাহের জন্য তৈরি রাখা হয়েছে ভাসমান আরেকটি সিন্ডিকেট। মূলত একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী লোকচক্ষুর আড়ালে বরফ কিনে বড় বড় ট্রলারে করে মাঝনদীতে নিয়ে যায় এবং সেখানে রাতের আঁধারে মা ইলিশ শিকার করা ট্রলারগুলোর কাছে চড়া দামে বরফ বিক্রি করে। একইসাথে গোপন ডিপো থেকে সংগৃহীত হাজার হাজার লিটার জ্বালানি তেলও মাঝনদীতে পৌঁছে দেওয়ার বন্দোবস্ত রাখা হয়েছে। আজ রাত ১২টায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে শত শত মাছ ধরা ট্রলার সামরাজ, নতুন স্লুইস, খেজুর গাছিয়া, ঢালচর, মাইনউদ্দিসহ বিভিন্ন ঘাট থেকে মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার দুর্গম মোহনা এবং সাগরের গহীন এলাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার চক্রান্ত চূড়ান্ত করেছে।
উপকূলীয় এলাকার একাধিক জেলে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূল মৌসুমজুড়ে লোকসান ও দাদনের কিস্তির চাপে জেলেরা এমনিতেই দিশেহারা। নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সরকারি সহায়তার অপর্যাপ্ততা এবং বিকল্প উপার্জনের পথ না থাকায় অসাধু আড়তদাররা এই চরম দারিদ্র্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। আড়তদার ও মহাজনদের পক্ষ থেকে জেলেদের ওপর আগাম চাপ তৈরি করা হচ্ছে—নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে হলেও নদীতে নেমে মাছ ধরে কিস্তির টাকা শোধ করতে হবে। ফলে জীবনের ঝুঁকি এবং আইনি সাজা—দুই ধরনের শঙ্কা মাথার ওপর ঝুললেও মহাজনের দেনার কাছে জিম্মি জেলেরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই বিপজ্জনক কাজে নামতে বাধ্য হচ্ছেন।
তবে জেলেদের এই করুণ চিত্র ও কৌশলের বিপরীতে আড়তদারদের মুখে শোনা যায় ভিন্ন কথা। সামরাজ মৎস্যঘাটের আড়তদার হেলাল উদ্দিন টিপু দাবি করেন, সামরাজ ঘাটের ৯৮ জন আড়তদার প্রায় দেড়শ কোটি টাকা দাদন হিসেবে বিনিয়োগ করেছেন। নদীতে আশানুরূপ মাছ পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে তেলের খরচই উঠছে না এবং আড়তদাররা ক্রমাগত লোকসান গুনছেন। তবে তারা সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলেন বলেও দাবি করেন।
আড়তদারদের এমন বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক মৎস্যজীবী বলেন, 'আড়তদাররা প্রায়ই যে ‘মাছ না পাওয়া’ বা ‘পরিশোধিত লোকসানের’ কথা বলেন, তা মূলত এক ধরনের চতুর কৌশল। একদিকে নদীতে মাছ থাকা সত্ত্বেও ঘাটে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের কাছ থেকে ইলিশের অতিরিক্ত ও মনগড়া দাম আদায় করা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক তদারকি ও আইনি সাজার হাত থেকে বাঁচতে জেলেদের এই চিরন্তন দারিদ্র্য ও ঋণের চিত্রকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন আড়তদারদের একাংশ। মূলত নিষেধাজ্ঞা চলাকালে যদি কোনোভাবে গোপনে মা ইলিশ শিকারে গিয়ে ট্রলারসহ জেলেরা ধরাও পড়েন, তাহলেও যেন ‘দেনার দায়ে বা অভাবে পড়ে জেলে নদীতে নেমেছে’—এমন অজুহাত তুলে আড়তদার ও দাদনদাররা আড়ালে থেকে নিজেদের দায় এড়াতে পারেন, সেই পথ তৈরি করে রাখাই এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য।' এর প্রভাবে শুধু যে জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তা নয়, মৎস্যঘাটগুলোতে সাধারণ ক্রেতারাও আড়তদারদের মনগড়া নিয়মের বলি হচ্ছেন।
স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিদের দাবি, প্রতিবছরই নিষেধাজ্ঞার আগে কাগজে-কলমে কঠোর নজরদারির কথা বলা হলেও বাস্তবে অসাধু দাদনদার ও ভাসমান বরফ বিক্রেতা চক্রটি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। তারা নিজেরা আড়ালে থেকে সাধারণ ও বাধ্য জেলেদের নদীতে ঠেলে দিয়ে কোটি কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা চালায়। প্রশাসনিক নজরদারি কেবল ঘাটের মুখে সীমাবদ্ধ না রেখে যদি ডাঙ্গার বরফকলগুলোর পাশাপাশি মাঝনদীতে বরফ বিক্রির ভাসমান ট্রলার, জ্বালানি তেলের লাইন এবং গহীন নদীতে যৌথ টহল জোরদার না করা হয়, তবে প্রতিবছরের মতো এবারও মা ইলিশ সুরক্ষার মূল লক্ষ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আইন অমান্য করে গোপনে মাছ শিকারের এই প্রস্তুতি ও সিন্ডিকেটের তৎপরতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, 'মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। কোনো অবস্থাতেই কাউকে আইন অমান্য করতে দেওয়া হবে না। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে স্থানীয় বরফকলগুলোর কার্যক্রম নিবিড়ভাবে মনিটরিং করা হবে, যাতে নদী বা সাগরে বরফ সরবরাহের কোনো সুযোগ না থাকে। পাশাপাশি মাঝনদীতে বরফ বিক্রি বা গোপনে ট্রলারে জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার যেকোনো অপচেষ্টা রুখতে আমাদের যৌথ টহল সার্বক্ষণিক জোরদার থাকবে। কেউ যদি গোপনে মাছ শিকারের চেষ্টা চালায় কিংবা জেলেদের বাধ্য করে, তার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে সর্বোচ্চ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।'
ভোরের আকাশ/ এনউব