১২ বছরে পা দিল ছিটমহল বিনিময়

ছিটমহল বিনিময়ের ১১ বছর পূর্ণ হয়ে ১২ বছরে পা দিয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা সাবেক ছিটমহলগুলোর বাসিন্দাদের নাগরিক জীবনের নতুন অধ্যায়। ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে দাসিয়ারছড়াসহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ১১১টি ছিটমহলের মানুষের দীর্ঘ ৬৮ বছরের অবরুদ্ধ জীবনের অবসান ঘটে। এরপর নাগরিকত্বের স্বীকৃতি পাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক নিরাপত্তাসহ নানা ক্ষেত্রে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে এসব এলাকায়। তবে সব অর্জনের পরও দাসিয়ারছড়াবাসীর সবচেয়ে বড় দাবি এখন স্বতন্ত্র ইউনিয়ন গঠন।
ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশে এবং ভারতের অভ্যন্তরে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ভারতে যুক্ত হয়। ভারতের ১৭ হাজার ১৬০ দশমিক ৬৩ একর আয়তনের ১১১টি ছিটমহল কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও পঞ্চগড় জেলার সঙ্গে যুক্ত হয়। এর মধ্যে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ারছড়া ছিল সবচেয়ে বড়। ১ হাজার ৬৪৩ দশমিক ৪৪ একর আয়তনের এ ছিটমহলের ৬ হাজার ৫২৯ জন বাসিন্দা বাংলাদেশি নাগরিকত্ব লাভ করেন।
ছিটমহল বিনিময়ের আগে এসব এলাকায় ছিল না স্বাভাবিক নাগরিক জীবনের সুযোগ। শিক্ষা ও চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, ভালো যোগাযোগব্যবস্থা কিংবা ভূমির স্বাভাবিক মালিকানা—সবই ছিল অধরা। নাগরিক পরিচয় গোপন করে অনেককে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতে হতো। জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা পাওয়াও ছিল কঠিন।
তবে বিনিময়ের পর গত ১১ বছরে পাল্টেছে পরিস্থিতি। নির্মিত হয়েছে সড়ক ও অবকাঠামো, পৌঁছেছে বিদ্যুৎ, উন্নত হয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা। ভূমির রেকর্ড ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হওয়ায় মানুষ পেয়েছে স্থায়ী পরিচয়ের স্বীকৃতি। কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায়ও এসেছেন অনেকে। সম্প্রতি দাসিয়ারছড়ার চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হওয়ায় শিক্ষা খাতে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। সরকারি-বেসরকারি চাকরিতেও যুক্ত হয়েছেন সাবেক ছিটমহলের অনেকে।
দাসিয়ারছড়ার সমন্বয়পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুর ইসলাম বলেন, “আমরা এবার এমপিওভুক্ত হয়েছি। বর্তমানে আমাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় আড়াইশ শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী অন্য ইউনিয়নের। আগে এখানকার শিক্ষার্থীদের পরিচয় গোপন করে অন্য ইউনিয়নে গিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হতো। এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই।”
কৃষিতেও এসেছে পরিবর্তন। দাসিয়ারছড়ার সার ও বীজ ঘরের স্বত্বাধিকারী খড়িয়াটারী গ্রামের আকবর আলী বলেন, “ছিটমহল বিনিময়ের পর বিএডিসির ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছি। সরাসরি সার ও বীজ এনে কালিহাট বাজারে বিক্রি করছি। দাসিয়ারছড়ার কৃষকেরা এখন সহজেই এখান থেকে সার ও বীজ সংগ্রহ করতে পারছেন।”
তবে উন্নয়ন হলেও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে দাসিয়ারছড়াবাসীর। বিনিময়ের পর দাসিয়ারছড়াকে ফুলবাড়ী, কাশিপুর ও ভাঙামোড়—এই তিন ইউনিয়নের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। ফলে একই এলাকার বাসিন্দাদের বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রশাসনিক সেবা নিতে হচ্ছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি সেবা পাওয়া ও উন্নয়ন কার্যক্রম সমন্বয়ে জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
বালাটারী ও জুলাটারী গ্রামের বাসিন্দা আছমা বেগম ও লায়েফ আলী বলেন, “আমরা অনেক কিছুই পেয়েছি। কিন্তু একটি জিনিস এখনো পাইনি—দাসিয়ারছড়া ইউনিয়ন। নতুন সরকারের কাছে আমাদের দাবি, দাসিয়ারছড়াকে স্বতন্ত্র ইউনিয়ন ঘোষণা করা হোক। এটি হলে আমাদের আর তেমন কোনো চাওয়া থাকবে না।”
বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, “দাসিয়ারছড়ায় মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করছেন। গত কয়েক বছরে এখানে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। এখন দাসিয়ারছড়াবাসীর প্রাণের দাবি হলো, এটিকে স্বতন্ত্র ইউনিয়ন হিসেবে গেজেট ঘোষণা করা। বিএনপি সরকারের কাছে এ ছিটমহলবাসী সেই আশায় বুক বেঁধে আছে। স্বতন্ত্র ইউনিয়ন হলে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার মানুষ সরাসরি বিভিন্ন সরকারি সেবা পাবে এবং দ্রুত বদলে যাবে তাদের জীবনযাত্রার মান।”
ছিটমহল বিনিময়ের এক যুগের দ্বারপ্রান্তে এসে দাসিয়ারছড়ার মানুষের জীবনে ৬৮ বছরের অবরুদ্ধতার স্মৃতি অনেকটাই মুছে গেছে। নাগরিক পরিচয়, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, যোগাযোগ ও বিভিন্ন সরকারি সুবিধা তাদের জীবনকে করেছে স্বাভাবিক। এখন তাদের প্রত্যাশা—উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতার সঙ্গে প্রশাসনিক স্বীকৃতিও পূর্ণতা পাক। দাসিয়ারছড়াকে স্বতন্ত্র ইউনিয়ন ঘোষণা করা হলে সেই প্রত্যাশা পূর্ণ হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ভোরের আকাশ/এনউব