দেড়শ বছরের পুকুর : দেড় হাজার পরিবারের শেষ ভরসা

ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় পানির জন্য অপেক্ষা। কলসি আর প্লাস্টিকের ড্রাম হাতে সারিবদ্ধ নারী-পুরুষ ও শিশুরা দাঁড়িয়ে থাকেন একটি পুকুরের পাড়ে। পুকুরটির বয়স প্রায় দেড়শ বছর। একসময় যে পুকুর ছিল পুরো গ্রামের প্রাণ, আজ সেটিই দেড় হাজার পরিবারের শেষ ভরসা—তবুও সেখানে নেই নিরাপদ পানি।
উপকূলীয় পাথরঘাটা উপজেলার কাঠালতলী ইউনিয়নের কালিবাড়ি গ্রামের ব্যক্তি মালিকানাধীন এই পুকুরের পানিই এখন রান্না, ধোয়া-মোছা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর একমাত্র উৎস। পানির রং লালচে-কালচে হয়ে গেলেও বিকল্প না থাকায় সেই পানিই ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় কাকলী রানী ও নুপুর রানী জানান, প্রতিদিন ভোরে এসে লাইনে দাঁড়াতে হয়। কখনও দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর মিলছে এক কলসি পানি। তারা বলেন, “পানি ভালো কি না জানি না, কিন্তু এই পুকুর ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।”
গ্রামবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পুকুরটি পুনঃখনন বা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্ষায় সামান্য পানি জমলেও শুষ্ক মৌসুমে তা দ্রুত কমে যায়। ফলে বছরের বেশির ভাগ সময়ই দেখা দেয় তীব্র সংকট। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, লবণাক্ততার বিস্তার ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
পানির এই সংকট নিরসনে গত শনিবার (৪ এপ্রিল) বেলা ১১টার দিকে পুকুরপাড়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শতাধিক নারী-পুরুষ। কলসি হাতে তারা পুকুর পুনঃখনন, পানি বিশুদ্ধকরণ ফিল্টার স্থাপন এবং স্থায়ী সুপেয় পানির ব্যবস্থার দাবি জানান।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক নাগরিক সংগঠন ‘ধরিত্রী রায় আমরা ধরা’র পাথরঘাটা উপজেলা সমন্বয়কারী ও উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক-গবেষক শফিকুল ইসলাম খোকন। তিনি বলেন, “উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। লবণাক্ততা ও খরার কারণে নিরাপদ পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত পুকুর পুনঃখনন, সংরক্ষণে সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং সৌরবিদ্যুৎচালিত পানি সরবরাহ প্রকল্প গ্রহণ করা জরুরি।”
ইউপি সদস্য জসিম তালুকদার জানান, পুকুরটি পুনঃখনন ও ফিল্টার স্থাপনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সমির কুলু ও শৈলেন মাঝি বলেন, বহু বছর ধরে পানির সংকটের কথা জানানো হলেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। “প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুম এলেই আমরা পানির জন্য হাহাকার করি,” বলেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট কেবল একটি গ্রামের সমস্যা নয়; এটি ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকির প্রতিচ্ছবি। টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগ ছাড়া এ সংকট নিরসন সম্ভব নয়।
দেড়শ বছরের ঐতিহ্যবাহী একটি পুকুর আজ দেড় হাজার মানুষের জীবনধারণের শেষ আশ্রয়। কিন্তু সেই আশ্রয়ও যখন অনিরাপদ—তখন সুপেয় পানির দাবি আর বিলাসিতা নয়, এটি মৌলিক অধিকার।
ভোরের আকাশ/আ.র