পরিকল্পিতভাবে কুপিয়ে হত্যা
বরিশালে আলোচিত লিটু হত্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস

আলোচিত স্বেচ্ছাসেবকদল নেতা লিটু সিকদার হত্যা মামলায় সুমন হাজারী নামের এক ব্যক্তি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
তার বক্তব্য অনুসারে ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই সদর উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের বিল্ববাড়িতে বরিশাল স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক লিটুকে পরিকল্পিতভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এবং এই হত্যাকান্ডে অন্তত ৩’শ বেশি লোক অংশ নিলেও মূল পরিকল্পনায় ছিল ১০/১২ জন। তাদের মধ্যেকার কজন রয়েছেন যারা এই মামলাটির এজাহারভুক্ত আসামি নন।
আদালত অভিযুক্ত সুমন হাজারীর জবানবন্দি গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট বরিশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বিমানবন্দর থানা পুলিশকে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন।
পুলিশ জানিয়েছে, আলোচিত এই হত্যা মামলাটির প্রধান অভিযুক্ত বরিশাল মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা রিয়াজ খান মিল্টন, এবং অধিকাংশ আসামিকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে সুমন হাজারী নামের যে আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, তিনি বর্তমানে কারান্তরীণ আছেন।
বিচারিক আদালতে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এজাহারের বাইরে থাকা মূল পরিকল্পনাকারী কজনের নাম উঠে এসেছে।
হুকুম দাতারা প্রকাশ্যে দিবালোকে প্রশাসনের নাকের ডগায় ঘুরে বেড়াচ্ছে যথাক্রমে, দুলাল গাজী, আব্দুল মালেক গাজী, জুয়েল, মুখার্জি পোল, নুরু তাদের সম্পর্কে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) রিয়াজুল ইসলাম। আলোচিত এই মামলার বাদী নিহত লিটু সিকদারের বোন মুন্নি আক্তার।
অবশ্য বাদী মুন্নির স্বামী জাকির গাজীও এই মামলায় প্রধান অভিযুক্তদের একজন। বাদী অভিযোগ করেন এমনকি সুমন হাজারীর দেওয়া স্বীকারোক্তিতে যাদের নাম মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে আলোচনায় এসেছে, তারাও মামলা তুলে নিতে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।
পুলিশসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সুমন হাজারীর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী একই এলাকার জাহিদ তালুকদার, দুলাল গাজী, বিল্ববাড়ির মিল্টন, জুয়েল এবং স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা লিটু সিকদার হত্যার মূল মাস্টারমাইন্ড। মূলত তাদের পূর্বপরিকল্পনার আলোকেই গত বছরের ৩১ জুলাই সন্ধ্যা রাতে নিজ বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করাসহ লিটু সিকদারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
সুমন হাজারীর ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত লিটু সিকদারের ওপর এলাকার বহু লোকের ক্ষোভ ছিল। এবং তাকে হত্যার একটি কৌশলও সাজিয়েছিলেন দুলাল গাজী, জাহিদ তালুকদার, ছোট জাহিদ, বিল্ব বাড়ি মিল্টন, বাগানবাড়ির মিল্টন, জুয়েল, এবং পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ৩১ জুলাই সন্ধ্যার দিকে লোকজন নিয়ে সকলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কাশিপুর বিল্ববাড়িতে প্রবেশ করে।
সুমন হাজারী জবানবন্দিতে বলেন, চিৎকার শুনে তিনি লিটু সিকদারের বাড়িতে গিয়ে দেখতে পান দুলাল গাজী এবং জাহিদ তালুকদারসহ সবাই বলেছিলেন, তোরা মারধর কর, ভাঙচুর কর, দেখবো পরে। এরপরে আমি ইটের টুকরা দিয়ে ঘরের জানালার থাই গ্লাস ভাঙচুর করি।
এরপর যাদের নাম বলেছি, সবাই ঘরে ঢুকে লিটু সিকদার, তার মা, বোন মুন্নি বেগম এবং লিটুর ভাই সুমনকে কোপানো শুরু করে। তবে সুমন হামলাকারী দুলাল গাজীর জামাই হওয়ায় তাকে তিনি বাঁচিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু লিটুকে মারার জন্য রেখে যায়।
তবে এই খুনের ঘটনায় প্রথমদিকে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে বরিশাল মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা রিয়াজ খান মিল্টনের ওপর দোষ চাপানো হচ্ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করলেও পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হয়েছেন। সূত্র জানিয়েছে, এই মিল্টন এবং লিটু উভয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং তাদের মধ্যেকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরে তাদের দুজনের মধ্যে স্থানীয়ভাবে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে লড়াই শুরু হয়। আদালতে দেওয়া সুমন হাজারীর স্বীকারোক্তির পরে পুলিশ মামলাটি তদন্তে কৌশল অবলম্বন করেছে। সুমন যাদের নাম মাস্টারমাউন্ড হিসেবে বিচারকের সামনে উল্লেখ করেছেন, এখন তাদের নজরদারির মধ্যে রাখছে। থানা পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্র এই তথ্য সাংবাদিকদের নিশ্চিত করে।
বিমানবন্দর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি/তদন্ত) সুমন আইচ সংবাদ সংযোগকে জানান, সুমন হাজারী যাদের নাম খুনের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে সামনে এনেছেন, লিটুর খুনে তাদের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
এতে কজনের সম্পৃক্ততাও পাওয়া যায়, কিন্তু পুরো তদন্তকাজ শেষ না হওয়ার আগে বিস্তারিত বলা সম্ভব হচ্ছে না।
ভোরের আকাশ/ র.ই