ভারতের পানিতে তিস্তা নদী অববাহিকায় অকাল বন্যা

ভারতের উজান থেকে ছেড়ে দেয়া পানিতে তিস্তা নদীপড়ে হঠাৎ বণ্যাপরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
তিস্তার উজানে ভারতের জলপাইগুড়ী জেলার জলঢাকায় অবস্থিত গজলডোবা ব্যারেজের সব কটি কপাট এক সাথে খুলে দেয়ায় বণ্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে|হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়েছে।
তলিয়ে গেছে ফসলের ক্ষেত। হুমকীর মূখে রংপুর কাকিনা সড়ক সহ দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু। সেতুর গাইড বাঁধে বিশাল ফাটল ধরেছে| ইতিমধ্যেই বাঁধের বিরাট একটি অংশ নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে।
আতঙ্কে দিনকাটাচ্ছে তিস্তা পড়ের কোটি মানুষ। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে তারা আহাজারী করছেন| অকাল বন্যা আর খরার হাত থেকে মুক্তি পেতে প্রধান মন্ত্রীর তারেক রহমানের কাছে তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নের দাবী তারা করেছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কতৃপক্ষ বলছে,গত ২৪ ঘন্টায় তিস্তানদী অববাহিকায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে| বৃষ্টির পানি আর পাহাড়ী ঢলের কারনে উজানে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত গজল ডোবা ব্যারেজের সব কটি গেট খুলে দিয়েছে।
তিস্তার দুই তীরের চরাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। লালমনির হাট জেলার তিস্তা নদীর ডালিয়ে ব্যারেজ পয়েন্টে ও রংপুর জেলার কাউনিয়া তিস্তা রেল সেতু পয়েন্টে নদীর পানি বিপদ সীমা অতিক্রম করেছে।
পানিউন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়ার পয়েন্টের নির্বাহী প্রকৌশলী জানিয়েছেন, গত রবিবার দিবাগত রাতে তিস্তার পানি বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। গতকাল বিকাল ৪ টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ডালিয়া ব্যারেজ পয়েন্টে তিস্তার পানি প্রবাহ ছিল ৫১.৯৯ সেন্টিমিটিার।
তিনি আশংকা প্রকাশ করেছেন এভাবে তিস্তানদীর পানি বৃদ্দি অব্যাহত থাকলে ব্যন্যা পুরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরী পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়েছে।
তিস্তা নদী বাংলাদেশ ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একটি আন্তঃসিমান্ত নদী। এটির জন্ম ভারতের সিকিমে। নদীটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ী জেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
তিস্তা নদীর উৎস উত্তর সিকিমের হিমালয় পর্বতমালার ৫,৩৩০ মি (১৭,৪৮৭ ফু) উচ্চতায় অবস্থিত সোলামো হ্রদে।হ্রদটি শেসচেনের কাছে ডোংখা গিরিপথের উত্তরে অবস্থিত।
তিস্তা নদী ছাঙ্গু, ইউমথাং ও ডোংকিয়া লা পর্বতশ্রেণী থেকে উৎপন্ন। সিকিমের রংপো ও পশ্চিমবঙ্গের তিস্তাবাজার শহরের কাছে ত্রিবেনীতে মিলিত|শিলিগুড়ি শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে সেবকের করোনেশন সেতু পেরিয়ে তিস্তা পশ্চিমবঙ্গের সমভূমি অঞ্চলে প্রবেশ করেছে।
তারপর পশ্চিমবঙ্গের, জলপাইগুড়ি জেলা,কোচবিহার জেলা ও বাংলাদেশের নিলফামারী লালমনির হাট গাইবান্ধা রংপুর জেলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তিস্তা মিশেছে ব্রহ্মপুত্রে।
বর্ষাকালে তিস্তায় দুকুল ছাপিয়ে বন্যা হয়। এই সময় তিস্তার আশেপাশের পাহাড়ে ধ্বস নামতেও দেখা যায়। ১৫০০ সালের পর থেকে বাংলার অনেক নদীর নদীখাতই ভৌগোলিক কারণে পরিবর্তিত হয়েছে। তিস্তা নদী তাদের মধ্যে একটি।
তিস্তা নদী আগে জলপাইগুড়ির দক্ষিণে তিনটি ধারায় প্রবাহিত হত: পূর্বে করতোয়া, পশ্চিমে পুনর্ভবা ও মধ্যে আত্রাই। সম্ভবত এই তিনটি ধারার অনুষঙ্গেই ত্রিস্রোতা নামটি এসেছিল, যেটি কালক্রমে বিকৃত হয়ে দাঁড়ায় তিস্তা। তিনটি ধারার মধ্যে পুনর্ভবা মহানন্দায় মিশত।
আত্রাই চলন বিলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে করতোয়ায় মিশত। তারপর আত্রাই-করতোয়ার যুগ্মধারাটি জাফরগঞ্জের কাছে মিশত পদ্মায়। ১৭৮৭ সালের এক বিধ্বংসী পর তিস্তা তার পুরনো খাত পরিবর্তন করে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মেশে।
১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের ব্যাপারে স্থির হয় যে, তিস্তা নদীর পানি শতকরা ৩৬ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ এবং ৩৯ শতাংশ পাবে ভারত।বাকী ২৫ শতাংশ পানি নদীটির সংরক্ষিত রাখা হবে। কিন্তু কী ভাবে এই ভাগাভাগি বিষয়ে কোন দিকনির্দেশনা ছিল না।
বহুকাল পরে ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৫, ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত একটি যৌথবৈঠকে বাংলাদেশ তিস্তার পানি ৮০ শতাংশ দু’দেশের সমান অংশে ভাগ করে অবশিষ্ট ২০ শতাংশ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে প্রস্তাব দেয়। ভারত এই প্রস্তাবে অসম্মতি প্রকাশ করে। নীলফামারীর তিস্তা নদীর উজানে ভারত জলপাইগুড়ি জেলার মালবাজার মহকুমায় গজলডোবা বাঁধ নির্মাণ করে বাংলাদেশে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রন করে।
২০১৪ খ্রিস্টাব্দের শুষ্ক মৌসুমে ভারত তিস্তার পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেয়|তিস্তার ব্যাপারে ভারত আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে এক তরফা ভাবে তিস্তার পানি প্রবাহ বন্ধ করে।
ফলে বাংলাদেশ অংশে তিস্তা মরে গেছে। পানি বণ্টনের ব্যাপারে ভারতের একগুয়েমিতা, অনৈতিক ঢিলেমি ও হটকারীতায় তিস্তা তীরবর্তি ও আশেপাশের প্রকৃতি রুক্ষ হয়ে উঠেছে। তলদেশে অজস্র পাথর, নুড়ি, বালি আর পলি পড়ে শুষ্ক মৌসুমে উত্তপ্ত বালুর স্তুপে পরিনত হয়।
অন্যদিকে বর্ষাকালে মুল গতিপথ বদলিয়ে তিস্তা প্রচন্ডভাবে আছরে পড়ে দুই তীরে। ফলে নির্দয় ভাঙ্গনে ফি বছর ২০ হাজার মানুষ বাড়িঘর, গাছপালা, আবাদী জমি হারিয়ে পথের ভিখেরী হয়। নদীর প্রবাহ পথে বিশাল চর ও উভয় তীরে ভাঙ্গনের তান্ডবে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে এর প্রস্থ কোন কোন জায়গায় ৫ কিলোমিটারেরও বেশি। কোন জায়গায় ৫০০ মিটার।
বাংলাদেশ সাত লক্ষ হেক্টর জমিতে তিস্তার পানি প্রবাহ দিয়ে সেচ প্রকল্প চালু করতে চায়। তিস্তায় এজন্য শুস্ক মৌসুমে কমপক্ষে প্রতি সেকেন্ডে ১৬০০ ঘন মিটার পানি প্রবাহ থাকা দরকার সেক্ষেত্রে শুস্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ থাকেনা বল্লেই চলে। আবার বর্ষাকালে বাধেঁর পানি ছেড়ে দিয়ে তিস্তাপাড়ের বিস্তৃর্ণ আঞ্চল ডুবিয়ে দেয় ভারত|এর ফলে প্রতিবছর তিস্তাপাড়ের অসংখ্য মানুষ সহায় স¤^ল হারিয়ে নিঃশ^ হচ্ছে।
এ সকল অসহায় মানুষের কান্না আর আহাজারিতে তিস্তার দু‘কূল ভাড়ি হয়ে উঠে। এ সকল মানুষ বর্তমান সরকারের কাছে এই অবস্খা থেকে পরিত্রান চায়। শুস্ক মৌষমে ধূ ধূ বালুচর আর বর্ষাকালে অকাল বন্যা এর হাত থেকে রক্ষায় সরকার এগিয়ে আসবেন এই আশায় তারা বুক বেধেঁ আছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে চীনের অর্থায়নে প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা ইস্যুটি প্রাধান্য পাবে বলে তারা আশাবাদী।
উল্লেখ্য, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তিস্তার পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রন করতে লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা উপজেলার দোয়ানী এলাকার ডালিয়ে পয়েন্টে দেশীয় প্রকৌশলী দেয়ে একটি বাধঁ নির্মান করেন। কিন্ত গজল ডোবায় বাধঁ দিয়ে ভারত তিস্তার পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় ডালিয়া ব্যারেজটিও হুমকীর মূখে পরেছে।
এদিকে সর্বশেষ তথ্যে জানগেছে, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর তিস্তার তীব্র স্রোতের তোড়ে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় মহিপুর তিস্তা সেতু রক্ষা বাঁধে ভয়াবহ ধস নেমেছে । মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ৯০০ মিটার দীর্ঘ এই প্রধান প্রতিরক্ষা বাঁধের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের অন্তত ৩০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে । যেখানে শক্ত বাঁধটি ছিল, পানির ঘূর্ণন স্রোতে সেখানে এখন তৈরি হয়েছে প্রায় ৬০ ফুট গভীর এক বিশাল ও বিপজ্জনক গর্ত।
শনিবার তিস্তা নদীতে হঠাৎ করে পানি বাড়তে শুরু করে। স্রোতের গতি এতোটাই তীব্র ছিল যে, রাত ৮টার মধ্যেই বাঁধের ৩০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। পানির ঘূর্ণন স্রোতের কারণে বাঁধের গোড়ায় প্রায় ৬০ ফুট গভীর খাদের সৃষ্টি হয়েছে , যা সরাসরি সেতুর মূল পিলারের স্থায়িত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এই ঘটনার পর থেকে নদী পাড়ের কয়েক হাজার মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, তিস্তা নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধিতে পানির প্রচণ্ড চাপ সামলাতে ডালিয়া পয়েন্ট এ ব্যারেজের সবকটি জলকপাট একসাথে খুলে রাখা হয়েছে। রংপুর বিভাগসহ এর উজানে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
ভোরের আকাশ/ র.ই