শিরোনাম
বিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রীবিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

আবর্জনা থেকে সম্পদ

প্লাস্টিক কুড়িয়ে জীবনের লড়াই, পরিবেশ রক্ষায় নীরব অবদান

বাকি বিল্লাহ চৌধুরী, চট্টগ্রাম

প্রকাশ : ৫ জুলাই ২০২৬, ২:২৩ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ছবি: ভোরের আকাশ
ছবি: ভোরের আকাশ

ভোরের আলো ফোটার আগেই যখন নগরবাসীর অধিকাংশ মানুষ ঘুমে আচ্ছন্ন, তখনই চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়ে যায় একদল মানুষের কর্মব্যস্ততা। কাঁধে বড় বস্তা, হাতে লোহার শিক কিংবা বাঁশের ঝুড়ি নিয়ে তারা বেরিয়ে পড়েন শহরের অলিগলি, বাজার, ডাস্টবিন, খোলা মাঠ এবং রাস্তার পাশের আবর্জনার স্তূপে। মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক, বোতল, পলিথিন, মোড়ক ও অন্যান্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য সংগ্রহ করেই চলে তাদের সংসার।

বাকলিয়া, চান্দগাঁও, হালিশহর, আগ্রাবাদ, কর্ণফুলী, পাহাড়তলী, বন্দর ও নগরের আরও অনেক এলাকায় প্রতিদিন শত শত নারী-পুরুষ এবং অনেক ক্ষেত্রে শিশুরাও এই পেশার সঙ্গে জড়িত। সমাজে তারা পরিচিত ‘বর্জ্য সংগ্রহকারী’ বা ‘টোকাই’ নামে। কিন্তু বাস্তবে তারাই শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক পরিবেশকর্মীদের একজন। কারণ তাদের হাত ধরেই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের চক্রে ফিরে আসে।

প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা শহরের বিভিন্ন স্থান ঘুরে প্লাস্টিকের পানির বোতল, কোমল পানীয়ের বোতল, খাদ্যপণ্যের মোড়ক, শ্যাম্পুর বোতল, প্লাস্টিকের ক্যান, পলিথিন এবং অন্যান্য প্লাস্টিকজাত সামগ্রী সংগ্রহ করেন। দিনের শেষে এগুলো বিক্রি করা হয় স্থানীয় আড়ত বা বর্জ্য সংগ্রহকেন্দ্রে।

সেখানে অভিজ্ঞ শ্রমিকরা প্লাস্টিকের ধরন অনুযায়ী আলাদা করেন। পিইটি (PET), এইচডিপিই (HDPE), এলডিপিই (LDPE) ও অন্যান্য প্লাস্টিক পৃথক করে রিসাইক্লিং কারখানায় পাঠানো হয়। কারখানায় এগুলো ধোয়া, শুকানো, কুচি করা এবং বিশেষ প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হয় প্লাস্টিক ফ্লেক্স ও গ্র্যানুল। পরে সেই কাঁচামাল দিয়ে তৈরি হয় নতুন বোতল, পাইপ, প্লাস্টিকের চেয়ার-টেবিল, গৃহস্থালি সামগ্রী, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ, শিল্পকারখানার উপকরণ এবং কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম।

দেশে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার শিল্প গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের চাহিদা বাড়ায় এই খাত নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে পিইটি বোতল পুনর্ব্যবহার করে তৈরি ফ্লেক্স ও গ্র্যানুলের চাহিদা দেশীয় শিল্পের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী উৎপাদনেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, এটি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়েও ভূমিকা রাখছে। কারণ পুনর্ব্যবহৃত কাঁচামাল ব্যবহারের ফলে নতুন প্লাস্টিক উৎপাদনের জন্য আমদানিনির্ভরতা কিছুটা কমে আসে।

এই সম্ভাবনাময় খাতের সবচেয়ে দুর্বল অংশ হলো বর্জ্য সংগ্রহকারীরা। প্রতিদিন দুর্গন্ধ, ধুলাবালি, বিষাক্ত রাসায়নিক, পচা আবর্জনা এবং চিকিৎসা বর্জ্যের মধ্যে কাজ করেও তারা পান সামান্য মজুরি। অনেক সময় ভাঙা কাঁচ, সিরিঞ্জ, মরিচা ধরা ধাতু কিংবা ধারালো বস্তুতে আহত হন তারা।

অধিকাংশ সংগ্রহকারীর কাছেই নেই গ্লাভস, মাস্ক, বুট বা অন্য কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম। ফলে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, সংক্রমণ, জ্বর, অ্যালার্জি এবং নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তাদের নিত্যসঙ্গী। তবুও পরিবারের খাবার জোগাড়ের জন্য প্রতিদিনই তাদের নামতে হয় আবর্জনার স্তূপে।

বাকলিয়ার বাসিন্দা রহিমা আক্তার প্রায় ১২ বছর ধরে প্লাস্টিক সংগ্রহ করছেন। স্বামীর অসুস্থতার পর সংসারের দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে। তিনি বলেন, সকালে বের হয়ে সারাদিন ঘুরে যা পাই, তা বিক্রি করে সংসার চালাই। কোনো দিন ভালো আয় হয়, কোনো দিন হয় না। বৃষ্টি হলে কাজও বন্ধ থাকে। ময়লার মধ্যে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ি। তারপরও কাজ না করলে পরিবারের খাবার জুটবে না।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান আরও অনেক সংগ্রহকারী। তাদের দাবি, সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেও তারা আজও অবহেলিত। নেই স্বাস্থ্যবিমা, নেই সামাজিক নিরাপত্তা, নেই স্থায়ী কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিক বর্জ্য বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় পরিবেশগত সংকট। নদী, খাল, নালা, সমুদ্র এবং কৃষিজমিতে প্লাস্টিক জমে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী, খাল এবং উপকূলীয় এলাকাও প্লাস্টিক দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বর্জ্য সংগ্রহকারীরা প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক সংগ্রহ করেন, তা পরিবেশ দূষণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তারা না থাকলে এই বর্জ্যের বড় অংশই খাল-নদী হয়ে সাগরে গিয়ে জমা হতো, যা জলজ প্রাণী ও বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারত।

পরিবেশবিদদের মতে, এই খাতকে আরও কার্যকর ও মানবিক করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন উৎস পর্যায়ে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য আলাদা করার ব্যবস্থা চালু করা। বর্জ্য সংগ্রহকারীদের পরিচয়পত্র, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা।গ্লাভস, মাস্ক, নিরাপত্তা জুতা ও অন্যান্য সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করা। আধুনিক রিসাইক্লিং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন এবং বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্লাস্টিক ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া।

আরও পড়ুন

হামে মেয়ের মৃত্যু, ড. ইউনূসসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন

প্রতিদিন শহরের মানুষ যে প্লাস্টিক অবহেলায় ফেলে দেন, সেটিই অসংখ্য মানুষের জীবিকার উৎস হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এই বর্জ্যই দেশের পুনর্ব্যবহার শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল এবং পরিবেশ রক্ষার একটি কার্যকর মাধ্যম। অথচ এই শ্রমজীবী মানুষগুলো এখনও সমাজের প্রান্তিক অবস্থানে রয়ে গেছেন।

একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও টেকসই নগর গড়ে তুলতে হলে শুধু রিসাইক্লিং শিল্পের উন্নয়নই নয়, সেই শিল্পের ভিত্তি গড়ে তোলা বর্জ্য সংগ্রহকারীদের জীবনমান উন্নয়নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা গেলে উপকৃত হবে মানুষ, পরিবেশ এবং দেশের অর্থনীতি সবই।

ভোরের আকাশ/ইউএম

জীবন, লড়াই

শেয়ার করুন: