বই-খাতার বদলে জাল-নৌকা,
উপকূলের শিশুদের শৈশব কাটছে নদী-সাগরে

যে বয়সে শিশুদের স্কুলে যাওয়ার কথা, বই-খাতা নিয়ে স্বপ্ন দেখার কথা—সে বয়সেই ভোলার চরফ্যাশনের উপকূলীয় এলাকার অনেক শিশু জীবন-জীবিকার তাগিদে নদী ও সাগরে মাছ ধরতে যাচ্ছে। উত্তাল ঢেউ, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও ট্রলারডুবির ঝুঁকি উপেক্ষা করে বড়দের সঙ্গে জাল টানা, মাছ বাছাই, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ এমনকি নৌকায় রান্নার কাজেও যুক্ত হচ্ছে তারা। দারিদ্র্য, পারিবারিক অসচ্ছলতা, নদীভাঙন ও জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতির কারণে অনেক শিশুই হারাচ্ছে শিক্ষার সুযোগ, আটকে পড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ জেলে পেশায়।
এটি একদিকে যেমন তাদের টিকে থাকার সংগ্রাম, অন্যদিকে উপকূলীয় জনপদে শিশুশ্রম ও দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতার চিত্র। চরফ্যাশনের উপকূলীয় এলাকায় দিন দিন জেলে শিশুর সংখ্যা বাড়ছে বলে স্থানীয় জেলে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
জেলেদের সঙ্গে নদী ও সাগরে যাওয়া এসব শিশু ট্রলারে বড়দের সঙ্গে জাল টানা, জাল থেকে মাছ ছাড়ানো, মাছ বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকে। কেউ কেউ নৌকায় বাবুর্চিকে রান্নার কাজেও সহযোগিতা করে।
আইনি নিষেধাজ্ঞা ও নানা কড়াকড়ি থাকা সত্ত্বেও দেশে শিশুশ্রমের প্রবণতা রয়েছে। চরফ্যাশনের উপকূলীয় অঞ্চলে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চরম দারিদ্র্য, পারিবারিক অসচ্ছলতা, নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব কারণে অনেক পরিবার চরাঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়ে মাছ ধরাকে জীবিকার প্রধান উৎস হিসেবে বেছে নেয়। অভাবের কারণে অনেক পরিবার সন্তানদের স্কুলে না পাঠিয়ে আয়ের উৎস হিসেবে নদী বা সাগরে মাছ ধরতে পাঠায়।
এ ছাড়া আড়তদার, মহাজন, নৌকা ও ট্রলার মালিকরা অনেক সময় কম মজুরিতে শিশুদের কাজে নেওয়ার সুযোগ পায়। দাদনের চাপ বা পারিবারিক প্রয়োজনেও শিশুরা জেলে পেশায় যুক্ত হচ্ছে। আবার বাবা-দাদার পেশা অনুসরণ করেও অনেক শিশু অল্প বয়সে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই মাছ ধরার নৌকায় উঠে পড়ে।
জেলে কামাল হাওলাদার বলেন, মাদ্রাজ ইউনিয়নে অবস্থিত সামুদ্রিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে নদী ও সাগরে মাছ ধরা প্রায় ৭০০ ট্রলার রয়েছে। এসব ট্রলারের মধ্যে অন্তত ২০০টিতে দুই থেকে তিনজন করে শিশু ও কিশোর জেলে রয়েছে।
জেলে সজীব জমাদার বলেন, বকশি মৎস্যঘাট, হাজারীগঞ্জ মৎস্যঘাট, নুরাবাদ গাছিরখাল মৎস্যঘাট ও নতুন স্লুইসগেট মৎস্যঘাট এলাকায় ছোট-বড় ইঞ্জিনচালিত নৌকা, ট্রলিং বোট ও ট্রলারে ১৮ বছরের কম বয়সী অনেক শিশু-কিশোর মাছ ধরার কাজে যুক্ত রয়েছে। তারা বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যায়।
সামরাজ মৎস্যঘাটের ‘আল্লাহর দান’ নামের একটি সামুদ্রিক ট্রলারের মাঝি বয়াতি কামাল বলেন, ১৫ থেকে ১৬ বছরের অনেক শিশুর মা বা পরিবারের সদস্যরা ঘাটে এসে জেলেদের অনুরোধ করেন। তারা বলেন, সংসারে উপার্জনক্ষম কেউ নেই, তাই ডাল-ভাতের জোগান দিতে ছেলেকে নদীতে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। অনেক সময় জেলেরা আবেগের বশে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের মাছ ধরতে নিয়ে যান, যা মোটেই উচিত নয়।
মনপুরার ‘মেঘনা’ নামের ট্রলারের জেলে নুরে আলম বলেন, তারা মাছ শিকার করে সামরাজ মৎস্যঘাটে মাছ বিক্রি করতে আসেন। এখানকার অনেক ট্রলারে কমপক্ষে দুইজন শিশু জেলে হিসেবে নদী ও সাগরে মাছ শিকারে যায়। তাদের বয়স ১৩ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। উত্তাল সাগরে এসব শিশু ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে।
এফবি মায়েরদোয়া ট্রলারের বাবুর্চি আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ঘাটের একাধিক ট্রলারে দুই থেকে তিনজন করে শিশু জেলে রয়েছে। তাদের বয়স আনুমানিক ১৩ থেকে ১৫ বছর। এসব শিশু জেলেদের সঙ্গে নদী ও সমুদ্রে গিয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। নদীতে ইলিশ পড়লে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও তারা মাছ ধরতে ঝুঁকি নেয়, যা তাদের জন্য অনিরাপদ। অনেক সময় বোট উল্টে বা ডুবে গিয়ে শিশুরাও নিখোঁজ হয়।
তিনি বলেন, কিছু শিশু বাবা বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ছোট নৌকা ও ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে নদীতে মাছ ধরতে যায়। তাদের কেউ কেউ বিনা পারিশ্রমিকেও পরিবারের সদস্যদের কাজে সহযোগিতা করে। তবে এসব শিশুর মধ্যে কেউ কেউ বিদ্যালয়েও পড়াশোনা করে।
মাদ্রাজ ইউনিয়নের সামরাজ মৎস্যঘাটের শিশু জেলে আবদুর রহিম (১৪) বলেন, ‘আমার বাবা নেই। তিন বছর আগে নদীতে মাছ শিকারে গিয়ে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে উত্তাল ঢেউয়ে বোট উল্টে বাবা নিখোঁজ হন। সংসারে চাল-ডাল কেনার মতো কেউ নেই। অভাবের সংসারে চাচার সঙ্গে নদীতে যাই। আমার ছোট দুটি বোন আছে। তাদের দেখার কেউ নেই।’
একই ঘাটের শিশু জেলে মো. আকবর হোসেন (১৪) বলেন, ‘আমার বাড়ি নীলকমল ইউনিয়নের বাংলাবাজার এলাকায়। বাবা না থাকায় মায়ের কথায় এলাকার মামার সঙ্গে বোটে এসেছি। আমি বাবুর্চিকে রান্নার কাজে, জাল থেকে মাছ ছাড়ানোসহ জেলেদের বিভিন্ন কাজে সাহায্য করি। নগদ টাকা ও মাছ পাই। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি।’
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, শিশু শ্রমের অন্যতম প্রধান কারণ দারিদ্র্য। গভীর সমুদ্রে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ট্রলারডুবির মতো ঝুঁকির মধ্যে কাজ করে এসব শিশু। অনেক সময় ট্রলারের মাঝিমাল্লা বা মালিকদের দ্বারাও শিশুরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে পারে।
শিশু সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন লিটল সিটিজেনস ফর ক্লাইমেটের বাংলাদেশ অ্যাম্বাসেডর সানজীদুল ইসলাম বলেন, শিশুশ্রম প্রতিরোধ আইনের সঠিক বাস্তবায়ন এবং শিশুদের সাগরে নেওয়া ট্রলার মালিকদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি উপকূলীয় ও বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে জেলে পরিবারগুলোর জন্য বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করতে হবে। এতে পরিবারগুলো শিশুদের কাজে পাঠাতে বাধ্য হবে না।
তিনি বলেন, দুর্গম চরাঞ্চলের শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রম, ভাসমান স্কুল বা প্রয়োজন অনুযায়ী নৈশকালীন বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলে পরিবারগুলোকে দেওয়া চাল ও অন্যান্য সহায়তার পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃত দরিদ্র ও ক্ষুদ্র জেলেরা যাতে এসব সুবিধা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে উপকূলের শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বের হয়ে নিরাপদ শৈশব ফিরে পেতে পারে।
চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম বলেন, নদী ও সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া শিশুদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি রয়েছে। নোনা পানি, দীর্ঘসময় রোদে কাজ করা এবং অপর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের কারণে তারা অপুষ্টি, চর্মরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে পারে।
উপজেলা মাধ্যমিক একাডেমিক সুপারভাইজার খলিলুর রহমান বলেন, চরফ্যাশনের হাজারীগঞ্জ, চর ফকিরা, ঢালচর, চর নিজামসহ বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন চর ও উপকূলীয় এলাকার বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী বছরের বড় একটি সময় নদী ও সাগরে মাছ ধরতে যায়। তরমুজ ও ধান কাটার মৌসুমেও অনেকে কাজে যুক্ত হয়। এতে অনেক শিশু শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়ে।
তিনি বলেন, অভিভাবক সমাবেশে শিশুশ্রম থেকে বিরত থাকার জন্য অভিভাবকদের নিরুৎসাহিত করা হয়। দরিদ্র পরিবারগুলো দৈনিক কিছু আয়ের আশায় সন্তানদের নদীতে পাঠায়। সরকার এসব পরিবারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে শিশুরা আবার বিদ্যালয়মুখী হতে পারে।
উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চরফ্যাশন নদীসংলগ্ন এলাকা হওয়ায় স্থানীয় ও বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মাছ ধরার নৌযান রয়েছে। এ উপজেলায় মোট ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের সংখ্যা ৬ হাজার ২৯৬টি। এসব ট্রলার ও মাছ ধরার নৌযানে কম বয়সী অনেক শিশু জেলে হিসেবে যুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, উপকূলের প্রায় ১৩ শতাংশ মানুষ এবং বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ঢালচর, চর নিজাম, মুজিবনগর, চর কুকরি-মুকরি, পাতিলার চরসহ বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের পেশা মৎস্য শিকার। এ অঞ্চলে জেলের সংখ্যা ৪৩ হাজার ২৮৫ জন। সমুদ্রগামী ট্রলার রয়েছে ৫০২টি, যার মধ্যে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ট্রলার ১৭১টি।
তিনি বলেন বলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ’ প্রকল্পের আওতায় জেলে পরিবারের ঝরে পড়া শিশু ও যুবকদের নিয়ে কাজ করা হয়েছে। তাদের ভোকেশনাল প্রশিক্ষণের আওতায় এনে হাউস ওয়্যারিং, ড্রাইভিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পরে তাদের চাকরির সুযোগও দেওয়া হয়। কিন্তু নদীতে মাছ পড়লে অনেক শিশু ও যুবক চাকরি ছেড়ে আবার মাছ ধরার কাজে ফিরে আসে। পরিবারের সদস্যরাও অনেক সময় তাদের মাছ ধরার কাজে ফিরে যেতে উৎসাহিত করেন।
চরফ্যাশন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মামুন হোসেন বলেন, শিশুদের সুরক্ষা ও শিশুশ্রম নিরসনে সরকার কাজ করছে। কেবল আইন প্রয়োগ বা সরকারি উদ্যোগে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা। উপকূলের ঝরে পড়া শিশু ও নদীতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহকারী শিশুদের পরিবার সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হলে তাদের সামাজিক পুনর্বাসনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আফরোজ বলেন, জাতীয় শ্রম আইন অনুযায়ী ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের কাজে নিয়োগ দেওয়া নিষিদ্ধ। শিশু সুরক্ষা ও শিশুশ্রম দমনে আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসন বিভিন্ন এলাকায় শিশুশ্রম বন্ধে অভিযান চালালেও পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। কিছুদিন পর আবার অনেক শিশু অভিভাবকদের কারণে অন্য কোনো পেশায় যুক্ত হয়ে পড়ে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হবে।
তিনি বলেন, শিশুশ্রমের ক্ষতি সম্পর্কে নদীতীরবর্তী ও চরাঞ্চলের অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। সাময়িক আয়ের জন্য শিশুর ভবিষ্যৎ নষ্ট করা কোনো সমাধান নয়। শিক্ষাই শিশুদের দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হওয়ার পথ তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি অসচ্ছল জেলে পরিবারগুলোকে ভিজিডি, ভিজিএফ বা বিশেষ ভাতার আওতায় এনে তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ভোরের আকাশ/সু.পা