রাজবাড়ীর পদ্মা ও মানিকগঞ্জের যমুনা
যখন বালু লুট হয় প্রশাসন তখন ঘুমায়

* সশস্ত্র পাহারায় বালু উত্তোলন
*একজনকে গুলি করে হত্যা
* তীব্র নদী ভাঙনের আশঙ্কা
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় পদ্মা নদী আর মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বালু খেকোরা। সশস্ত্র পাহারায় তারা বালু লুট করছেন। দুর্বৃত্তদের গুলিতে একজন নিহত হয়েছেন। দুপক্ষের মধ্যে গোলাগুলিও হয়েছে। যেকোনো সময় আরও প্রাণহানি হতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন আর রাজনৈতিক দলের লোকজনকে ‘ম্যানেজ’ করেই চলছে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বালু লুট। বড় ড্রেজার দিয়ে প্রতিনিয়ত বালু কাটায় নদী ভাঙনের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তাদের শঙ্কা আর নীরব আহাজারি কারো কানে পৌঁছায় না। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, যখন বালু লুট হয়, প্রশাসন তখন ঘুমায়।
তাদের এই ঘুম কখন ভাঙবে?
জানা গেছে, সন্ধ্যা নামলেই গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় গর্জে উঠে রাজবাড়ী জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম পাল ওরফে শহিদ পালের ৩টি বড় ড্রেজার। সশস্ত্র অবস্থায় উত্তোলন করা এসব বালু নদী থেকেই বাল্কহেডে পৌঁছে যায় বিভিন্ন স্থানে। বালু বিক্রি করে প্রতি রাতে অন্তত ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তিনি। সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের লোক পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার এবং প্রশাসন ও দলীয় নেতাদের ম্যানেজ করেই তিনি বালু লুট করে চলেছেন। ম্যানেজ করার কথা উঠে এসেছে শহিদ পালের বক্তব্যেই।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর লাইমলাইটে চলে আসেন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা শহিদুল ইসলাম পাল ওরফে শহিদ পাল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তিনি দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় পদ্মা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসছেন। বর্তমানে ১৮ ইঞ্চির তিনটি কাটার (বড় ড্রেজার) রাকিব ২, নবীজীর দোয়া ৩ ও তাজ দিয়ে বালু উত্তোলন করছেন। দিনে কাটারগুলো ফেরিঘাটের অদূরে বেঁধে রাখা হয়। রাত ৭-৮টায় এগুলো ঘাট এলাকায় এনে বালু উত্তোলন করা হয়। সশস্ত্র অবস্থায় ভোর পর্যন্ত চলে এই বালু লুট। বাল্কহেডে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব বালু পাঠানো হচ্ছে। প্রতিরাতে অন্তত ৫ লাখ আয় করছেন তিনি।
গোয়ালন্দ উপজেলা বিএনপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী-১ আসনের এমপি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। তিনি অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন প্রশাসনকে। কিন্তু শহিদ পাল অবাধে বালু উত্তোলন করছেন। কেউ কিছু বলছেন না। সবাই জানেন কিন্তু চুপ। এর কারণ কী? কারণ তিনি সবাইকে ম্যানেজ করেই চলেছেন। তিনি টাকা দিয়ে সবার মুখ বন্ধ করে রেখেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই নেতা বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে দলটির নেতা নুরুল ইসলাম মন্ডল দৌলতদিয়ায় একটি নিজস্ব ‘অপরাধ রাজ্য’ গড়ে তুলেছিলেন। তিনি সব অপকর্ম নিয়ন্ত্রণ করতেন। সেই রাজ্য এখনো আছে। তবে নিয়ন্ত্রণ ভাগ হয়ে গেছে। বালুর ‘রাজ্য’ নিয়ন্ত্রণ করছেন শহিদ পাল।
গোয়ালন্দে বালু উত্তোলন ও মাদকদ্রব্য বিক্রির বিরুদ্ধে সোচ্চার উপজেলা জিয়া সাইবার ফোর্সের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সাঈদ ফকির ভোরের আকাশ’কে বলেন, তিনি মাদকদ্রব্য বিক্রি ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ থেকে সরে আসতে বিএনপির কিছু নেতা তাকে চাপ প্রয়োগ করছেন। কিন্তু তিনি তার অবস্থান থেকে সরবেন না।
আরেকটি সূত্র জানায়, পদ্মা নদীতে বালু লুট চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন শহিদ পাল। তার রাজনৈতিক কানেকশন শক্ত। তিনি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের লোক পরিচয় দিয়ে বালু লুট করে চলেছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পাচ্ছেন না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক কৃষক বলেন, ‘রাতের অন্ধকারে প্রতিদিন নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। তিনটি মেশিন (ড্রেজার) ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলো কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশ জানে। তাদের সামনেই রাত ৮টা-৯টা থেকে শুরু করে ভোর ৬টা-৭টা পর্যন্ত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এভাবে প্রতিনিয়ত বালু উত্তোলন হলে নদীভাঙনের কবলে পড়বে এলাকা। এতে শত শত হেক্টর আবাদি জমি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ তিনি বলেন, বালু উত্তোলন নিয়ে ১২ মে দৈনিক ভোরের আকাশ-এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। ওইদিন বালু উত্তোলন বন্ধ ছিল। পরদিন দুটি ড্রেজার দিয়ে এবং এর পরদিন তিনটি ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন চলছে।
সূত্র জানায়, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের নিয়ন্ত্রণ নিতে একটি চমরপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই চক্রের সঙ্গে শহিদ পালের লোকজনের সম্প্রতি গোলাগুলি হয়েছে। তবে কেউ হতাহত হননি। এই বালু উত্তোলন এখন বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে প্রাণহানি হতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে শহিদুল ইসলাম পাল ভোরের আকাশ’কে বলেন, ‘আমি অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছি না। মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থেকে বালু কিনে এনে ব্যবসা করছি।’ এক প্রশ্নে তিনি তিনি বলেন, ‘রাজবাড়ীতে বিএনপির দুটি গ্রুপ আছে। আমি প্রতিমন্ত্রী খৈয়ম গ্রুপের লোক। আসলাম গ্রুপের লোকজন পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার করছেন।’ তিনি বলেন, বালুর ব্যবসা থেকে যে লাভ হয়, তা থেকে দলীয় ভাই-ব্রাদারদের কিছু দিয়ে থাকি। কিন্তু এটা কিছু লোক পছন্দ করে না। তারাই অপপ্রচার করছেন।
ম্যানেজ হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাথী দাস ভোরের আকাশ’কে বলেন, সম্প্রতি অভিযান চালানো হয়েছে। ১০জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ড্রেজার ও বাল্কহেড জব্দ করা হয়েছে। ‘ওই অভিযান চালানো হয়েছে কলাবাগান এলাকায়; যা ফেরি ঘাট থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে। আপানারা শহিদ পালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না’Ñএই প্রশ্নে তিনি বলেন, অভিযানটা শহিদ পালের বিরুদ্ধে কি-না তা জানি না। তবে প্রশাসন সোচ্চার আছে। অভিযান অব্যাহত থাকবে।
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীনের মোবাইল ফোনে একাধিক বার কল করা হয়। তবে তিনি ফোনকল গ্রহণ করেননি। অন্যদিকে, দৌলতদিয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ওসি ত্রিনাথ সাহা ভোরের আকাশ’কে বলেন, আমরা উপজেলা প্রশাসনের সহায়ক ফোর্স হিসেবে কাজ করি। তারা অভিযান চালালে আমরা যাই। আমরা এককভাবে অভিযান পরিচালনা করি না। আপনি উপজেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করুন।
গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি সফিকুল ইসলাম ভোরের আকাশ’কে বলেন, দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় পদ্মা নদীতে বালু লুটের ঘটনা তার নজরে নেই। দুই পক্ষের গোলাগুলির বিষয়টি তিনি জানেন না বলে জানিয়েছেন।
যমুনায় ইজারার বাইরে বালু উত্তোলন: মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা বালুমহাল এক বছরের জন্য ইজারা নিয়েছে অয়ন এন্টারপ্রাইজ। কিন্তু ঠিকাদারের লোকজন কয়েকটি ড্রেজার দিয়ে ইজারাস্থল থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে আলোকদিয়া চর এলাকায় যমুনা নদী থেকে বালু উত্তোলন করছেন। সশস্ত্র পাহারায় প্রতিদিন অন্তত ৫ লাখ টাকার বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ মুখ খোলেন না। এমনকি কোনো সাংবাদিকও ঘটনাস্থলে যান না। গত ৩ এপ্রিল বালুমহালের একজনকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, যমুনা নদী সময়ে-অসময়ে ভাঙে। প্রতিবছরই বিপুল সংখ্যক ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অবাধে বালু উত্তোলন করায় ভাঙন আরও তীব্র হয়েছে। শিবালয়, ঘিওর ও দৌলতপুর উপজেলায় প্রতিনিয়ত নদী ভাঙছে। কিন্তু বালু খেকোদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
ইজারার বাইরে গিয়ে বালু কাটার বিষয়টি উঠে এসেছে অয়ন এন্টারপ্রাইজের মালিক অয়ন খানের কথায়। জেলা ছাত্রদলের একজন নেতা পরিচয় দিয়ে তিনি ভোরের আকাশ’কে বলেন, এটা তার ব্যবসার ব্যবসা ছিল। তিনি মারা গেলে কয়েক বছর আগে তিনি (অয়ন) ব্যবসার হাল ধরেন। তাদের একটি কাটার (ড্রেজার) কয়েক দিন আগে আলোকদিয়ায় বালু কেটেছিল। তখন শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিছু টাকা জরিমানা করেছেন। এরপর থেকে সীমানার বাইরে তারা বালু কাটছেন না। নিউজ না করার অনুরোধ করে তিনি বলেন, অ্যাডভোকেট সুজাত নামে এক লোক তাদের ব্যবসা দেখভাল করছেন। মূলত তাকে সাব-ইজারা দেওয়া হয়েছে। তার সাথে যোগাযোগ করারও অনুরোধ করেন তিনি।
মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা ভোরের আকাশ’কে বলেন, শিবালয়ে সীমানার বাইরে গিয়ে বালু কাটার বিষয়টি তিনি জানতেন না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেবেন জানিয়ে তিনি বলেন, সীমানার বাইরে গিয়ে বালু কাটার সুযোগ নেই।
গুলিতে নিহত ১: মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলায় বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত মিরাজ হোসেন (৪০) উপজেলার তেওতা বালুমহালের ব্যবস্থাপক ছিলেন। তিনি পাবনা সদর উপজেলার দাপুনিয়া এলাকার বাসিন্দা।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, বিকাল ৫টার দিকে আলোকদিয়া চরে মিরাজ হোসেন বালুমহালের ড্রেজারে বসে হিসাব-নিকাশ করছিলেন। এ সময় স্পিডবোটে করে আসা একদল লোক তাকে লক্ষ্য করে কয়েকটি গুলি ছোড়ে। এতে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। পরে হামলাকারীরা তাকে কুপিয়ে পালিয়ে যায়। গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শিবালয় থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মানবেন্দ্র বালো ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
ভোরের আকাশ/এনএস