ডিপিপিএইচের সংবাদ সম্মেলন
হাম পরিস্থিতিকে ‘মহামারি’ ঘোষণা করে জরুরি পদক্ষেপের দাবি

ছবি- ভোরের আকাশ
দেশে চলমান হামের পরিস্থিতিকে ‘মহামারি’ হিসেবে ঘোষণা করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ (ডিপিপিএইচ)। এছাড়াও অবিলম্বে গণটিকাদান কর্মসূচি চালুর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে (ডিআরইউ) ‘হামে শিশুমৃত্যু: জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে করণীয়’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান ডিপিপিএইচের সঙ্গে যুক্ত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকেরা।
ডিপিপিএইচের নেতারা বলেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হলেও সময়মতো কার্যকর টিকাদান কর্মসূচি জোরদার না করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে প্রথমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। এমনকি টিকা নেওয়া ও ৯ মাসের কম বয়সি শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
তারা আরও বলেন, টিকা সংগ্রহে গাফিলতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং জনস্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিরোধযোগ্য এ মৃত্যুর জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
ডিপিপিএইচ নেতারা সতর্ক করে বলেন, হামের সংক্রমণ ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি এবং আক্রান্ত ব্যক্তি উপসর্গ প্রকাশের আগেই অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে দিতে পারে। এতে নিউমোনিয়া, অন্ধত্ব, মস্তিষ্কের প্রদাহসহ নানা জটিলতা তৈরি হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। সংগঠনটি দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ হিসেবে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বৃদ্ধি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার, সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, ভ্যাকসিন উৎপাদনে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেয়।
তারা বলেন, বর্তমান সংকট স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতার একটি স্পষ্ট বার্তা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। এজন্য সরকার, গণমাধ্যম, অভিভাবক এবং সমাজের সব স্তরের মানুষকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, কোনো রোগের বিস্তার যখন সময়, স্থান ও আক্রান্ত ব্যক্তির বিবেচনায় অস্বাভাবিক হয়, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যায় এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা সেটাকে সামাল দিতে পারে না, সেটা জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি। বর্তমানে হামের বিস্তার এ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে ডিপিপিএইচ মনে করছে। তাই সরকারের কাছে ‘জরুরি পরিস্থিতি’ ঘোষণার আহ্বান জানাচ্ছে সংগঠনটি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ডিপিপিএইচের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, হামের কারণে যে সব শিশুর মৃত্যু হয়েছে, এই মৃত্যুগুলো প্রতিরোধযোগ্য ছিল। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিলে শিশুদের প্রাণ বাঁচানো যেত। আমরা মনে করি, অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা সংগ্রহে গাফিলতি ও আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিকে (ইপিআই) দুর্বল করে দিয়েছে। এই অবহেলার জন্য দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
দেশে হামের মহামারি চলছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার স্বীকার করুক বা না করুক, দেশে বর্তমানে হামের মহামারি চলছে। জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি বা রাজনৈতিক পরিণতির ভয়ে হয়তো সরকার এটিকে জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসেবে ঘোষণা করতে দ্বিধা করছে।তবে সরকার ইতোমধ্যে গণটিকা কর্মসূচি শুরু করায় আগামী দেড় মাসের মধ্যে সংক্রমণ এবং আড়াই মাসের মধ্যে মৃত্যুহার কমে আসতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মুশতাক হোসেন বলেন, মহামারি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সব কাজ করছে সরকার। চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল আর নিরবচ্ছিন্ন সেবার মতো উদ্যোগ নিয়েছে। বাড়তি চিকিৎসকও নিয়োগ দিচ্ছে। শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, হাম সংক্রমণ করোনার চেয়েও দ্রুত হয়। টিকা দিলেও তাৎক্ষণিক সেটার কার্যকারিতা পাওয়া যায় না। দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় হাসপাতালের সেবাকে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।
দেশে আগে হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি হাজারে তিনজনের মৃত্যু হতো। এবার তা ১০ জনে পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করেন আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন। তিনি বলেন, মৃত্যুহার বাড়ার কারণ উদ্ঘাটনে সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হবে।
সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক শিশুরা।
শিশুবিশেষজ্ঞ কাজী রকিবুল ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুধু হামের টিকা দেওয়া হয়নি এমন নয়, হাম–পরবর্তী শিশুদের রাতকানাসহ যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে, সেগুলো প্রতিরোধেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ডিপিপিএইচের দাবি ও সুপারিশ
হামের পরিস্থিতি মোকাবিলায় ডিপিপিএইচ কয়েকটি জরুরি উদ্যোগের দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অবিলম্বে সারা দেশে গণটিকাদান কর্মসূচি চালু করা। আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য উপজেলা থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। টিকা নিয়ে সমাজে বিদ্যমান ভুল ধারণা আর গুজব মোকাবিলায় কার্যকর জনসচেতনতা কার্যক্রম চালু করা, শক্তিশালী রোগ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা করা। সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি নীতিগত সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়।
এর মধ্যে রয়েছে পুষ্টি আর ভিটামিন–এ কার্যক্রম জোরদার করা। অপুষ্ট শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়া। মাতৃদুগ্ধ পান ও পুষ্টি কর্মসূচি শক্তিশালী করা, স্বাস্থ্য সংস্কার বাস্তবায়ন ও বাজেট বাড়ানো, হাম নির্মূল কৌশলপত্র পুনরায় সক্রিয় করা, টিকার সরবরাহ শক্তিশালী করা, টিকা উৎপাদনে জাতীয় সক্ষমতা বাড়িয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা। স্বাস্থ্যকে জনগণের মৌলিক অধিকার হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া এবং ছয়টি বিভাগে নির্মিত শিশু হাসপাতালগুলো দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা।
সংবাদ সম্মেলনে সদস্যসচিব শাকিল আখতারের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন সংগঠনের সদস্য ফয়জুল হাকিম।
ভোরের আকাশ/এসএইচ



