বিশেষ

খাবার, পানি ও বাতাসে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিস্তার, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

ছবি: সংগৃহীত

পানীয় জল, খাদ্য, পোশাক, এমনকি আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই—সবখানেই এখন মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। সমুদ্রের গভীরতা থেকে অ্যান্টার্কটিকার বরফ, এভারেস্টের চূড়া থেকে মানবদেহ—প্রায় সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে এই অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় মানবদেহের মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র, রক্ত, প্লাসেন্টা, বুকের দুধ, প্রস্রাব, প্রজনন অঙ্গ এবং নবজাতকের প্রথম মল পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, ৫ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ থেকে ৪ কোটি টন মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে এই পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে।

মাইক্রোপ্লাস্টিকের উৎস শুধু বড় প্লাস্টিকের বর্জ্য নয়। প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট ও অন্যান্য সামগ্রী সময়ের সঙ্গে ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। পাশাপাশি রং, টুথপেস্ট, প্রসাধনী এবং বিভিন্ন পরিষ্কারক পণ্যেও ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা ব্যবহার করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের শিশু সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ডিজায়ারি লাবিউড বলেন, প্লাস্টিক কখনো পুরোপুরি নষ্ট হয় না; বরং সময়ের সঙ্গে আরও ক্ষুদ্র কণায় বিভক্ত হতে থাকে। ফলে এর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

প্লাস্টিকের যাত্রা শুরু হয় ১৯০৭ সালে, যখন বেলজীয় রসায়নবিদ লিও বেকেল্যান্ড বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ কৃত্রিম প্লাস্টিক উদ্ভাবন করেন। টেকসই, হালকা, নমনীয় ও কম খরচে উৎপাদনযোগ্য হওয়ায় এটি দ্রুত চিকিৎসা, নির্মাণ, পোশাক এবং খাদ্য মোড়কজাতকরণসহ বিভিন্ন খাতে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। তবে এই দীর্ঘস্থায়ী বৈশিষ্ট্যই এখন বড় পরিবেশগত সংকটের কারণ। ভেঙে ভেঙে তৈরি হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রজাতির প্রাণীর শরীরেও শনাক্ত হয়েছে।

মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা চললেও এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য উদ্বেগজনক। গবেষকরা মানবদেহের মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র, প্লাসেন্টা, অণ্ডকোষ, পাকস্থলী, লিম্ফ নোডসহ বিভিন্ন অঙ্গে এর উপস্থিতি পেয়েছেন। পাশাপাশি প্রস্রাব, মাতৃদুগ্ধ, বীর্য এবং নবজাতকের প্রথম মলেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।

গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করা, কোষের ক্ষতি এবং বিপাকীয় কার্যক্রমে পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কিছু গবেষণায় এটি প্রজনন, পরিপাক ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা এবং কোলন ও ফুসফুসের ক্যানসারের সম্ভাব্য ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৪ সালে দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, যাদের ধমনির প্লাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, তাদের হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং মৃত্যুর ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে, কারণ তাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ তখনও বিকাশমান থাকে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় শিশুদের টনসিলের গভীর অংশেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষকরা এখন খতিয়ে দেখছেন, এর সঙ্গে থাইরয়েড বা অন্যান্য হরমোনজনিত সমস্যার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না।

তবে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে কতদিন অবস্থান করে বা দীর্ঘমেয়াদে ঠিক কী ধরনের ক্ষতি করে। এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সম্ভব না হলেও এর সংস্পর্শ অনেকটাই কমানো যায়। এজন্য একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহার, প্লাস্টিকের বোতলে দীর্ঘ সময় পানি সংরক্ষণ না করা এবং অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকজাত পণ্যের ব্যবহার সীমিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগই এই নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ।

 

খাবার, পানি ও বাতাসে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিস্তার, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি | স্বাস্থ্য কথা | ভোরের আকাশ