ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক, তবে কিছু লক্ষণ হতে পারে সতর্কবার্তা

ছবি: সংগৃহীত
দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততায় চাবি কোথায় রেখেছেন ভুলে যাওয়া, পরিচিত কারও নাম হঠাৎ মনে না পড়া কিংবা কোনো ঘরে ঢুকে আসার কারণ ভুলে যাওয়ার ঘটনা অনেকেরই ঘটে। তবে প্রশ্ন হলো, এসব কি বয়স বাড়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, নাকি কোনো বড় রোগের পূর্বসংকেত? বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঝে মাঝে ভুলে যাওয়া মানুষের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতার অংশ। তবে যখন স্মৃতিভ্রম নিয়মিত হতে শুরু করে এবং তা দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্বাভাবিক ভুলে যাওয়া কী?
বিশেষজ্ঞ নিউরোলজিস্ট ড. বিশাল জৈনের মতে, স্বাভাবিক ভুলে যাওয়া বলতে বোঝায় সাময়িক স্মৃতিভ্রম, যা মানুষের দৈনন্দিন কাজ বা স্বাধীনভাবে জীবন পরিচালনায় বড় কোনো বাধা সৃষ্টি করে না।
যেমন—মাঝে মাঝে কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা পরিচিত কারও নাম ভুলে যাওয়া, চশমা বা চাবি কোথাও রেখে সাময়িকভাবে খুঁজে না পাওয়া, কিংবা কোনো তথ্য মনে করতে কিছুটা বেশি সময় নেওয়া। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার গতি কিছুটা কমে যেতে পারে। ফলে ছোটখাটো স্মৃতিভ্রম দেখা দিতে পারে, যা সবসময় ডিমেনশিয়া বা গুরুতর কোনো রোগের লক্ষণ নয়।
ভুলে যাওয়ার সাধারণ কারণ
সবসময় কোনো রোগের কারণে স্মৃতিশক্তি কমে যায় না। জীবনযাত্রার কিছু বিষয়ও এর জন্য দায়ী হতে পারে।
১. ভিটামিনের ঘাটতি:
বিশেষ করে ভিটামিন বি-১২ ও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
২. হরমোনের পরিবর্তন:
বিশেষ করে নারীদের মেনোপজের সময় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তিতে সাময়িক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
৩. মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা:
অতিরিক্ত স্ট্রেস বা উদ্বেগের কারণে শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়তে পারে, যা মস্তিষ্কের মনোযোগ ও তথ্য সংরক্ষণের ক্ষমতায় প্রভাব ফেলে।
৫. অপর্যাপ্ত ঘুম:
ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সাজিয়ে সংরক্ষণ করে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ দুর্বল হতে পারে।
৫. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া:
কিছু ওষুধ, যেমন—অ্যান্টিহিস্টামিন, ঘুমের ওষুধ বা বিষণ্নতা নিয়ন্ত্রণের কিছু ওষুধের কারণে স্মৃতিশক্তি ঝাপসা হতে পারে।
কখন সতর্ক হওয়া জরুরি?
স্মৃতিভ্রম যদি নিয়মিত হতে থাকে এবং দৈনন্দিন কাজে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত—
একই প্রশ্ন বারবার করা এবং নতুন শেখা তথ্য দ্রুত ভুলে যাওয়া।
পরিচিত জায়গায় পথ হারিয়ে ফেলা বা দিক চিনতে সমস্যা হওয়া।
টাকা-পয়সার হিসাব বা নিয়মিত ওষুধ ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হওয়া।
কথোপকথনের সময় সঠিক শব্দ খুঁজে পেতে অসুবিধা হওয়া।
সময়, তারিখ বা স্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া।
আচরণ, ব্যক্তিত্ব বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় আকস্মিক পরিবর্তন আসা।
মস্তিষ্কের সুস্থতায় করণীয়
স্মৃতিশক্তি ভালো রাখতে এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে কিছু অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ—
নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম: ব্যায়াম মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।
সুষম খাবার ও পর্যাপ্ত ঘুম: পুষ্টিকর খাবার এবং গভীর ঘুম মস্তিষ্কের পুনর্গঠন ও কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়ক।
মস্তিষ্কের অনুশীলন: বই পড়া, পাজল সমাধান, শব্দজট বা নতুন কিছু শেখার অভ্যাস মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে।
ক্ষতিকর অভ্যাস এড়িয়ে চলা: ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান থেকে বিরত থাকা মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা: একাকীত্ব কমিয়ে পরিবার, বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মাঝে মাঝে ভুলে যাওয়া অনেক সময় বয়স বাড়ার স্বাভাবিক অংশ হতে পারে। তবে স্মৃতিভ্রম যখন দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে শুরু করে, তখন সেটিকে শুধু বার্ধক্যের লক্ষণ হিসেবে উপেক্ষা করা ঠিক নয়। সময়মতো কারণ শনাক্ত করা এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যসূত্র: এনডিটিভি
ভোরের আকাশ/সু.পা



