স্ত্রীর দেনমোহর পাওয়ার জন্য তালাক বা স্বামীর মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না: হাইকোর্ট

স্ত্রীর দেনমোহর পাওয়ার জন্য বিবাহবিচ্ছেদ (তালাক) বা স্বামীর মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। এটি স্ত্রীর একচেটিয়া ও স্বাধীন আর্থিক অধিকার এবং স্ত্রী চাওয়ামাত্রই স্বামী তা পরিশোধ করতে বাধ্য বলে এক রায়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদালত বলেছেন, প্রচলিত আইনগত অবস্থান হলো, তাৎক্ষণিক দেনমোহর স্বামীর ওপর স্ত্রীর পাওনা। এই পাওনা আদায়ের জন্য স্ত্রীর কাছে কিছু গচ্ছিত থাকে না। কিন্তু এটা তার আদায়যোগ্য। এই দেনমোহর অবিলম্বে পরিশোধ করতে হবে।
‘ইয়াকুব আলী বনাম সানজিদা নাসরিন’—দেওয়ানি রিভিশন মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া রায়ে এমন পর্যবেক্ষণ এসেছে। বিচারপতি আবদুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ৩ সেপ্টেম্বর ওই রায় দেন। ৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, দ্রুত দেনমোহর আদায়ের জন্য কোনো স্ত্রীকে যদি আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়, তাহলে ঘটনা বিবেচনা করে দেনমোহর পরিশোধের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও স্বামী যদি তা দিতে বিলম্ব করেন, সে ক্ষেত্রে বিচারিক আদালত স্ত্রীকে ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেওয়ার এখতিয়ার রাখেন।
বিভিন্ন সুরার আয়াত উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়, এসব আয়াত পবিত্র কোরআনের আলোকে একটি রূপরেখা দেয়। এতে প্রতীয়মান হয়, মোহর (দেনমোহর) স্ত্রীর একটি আর্থিক ও স্বতন্ত্র অধিকার। এটি বিয়ে থেকে তৈরি হওয়া একটি বাধ্যবাধকতা। স্বামী তা ফেরত দাবি করতে পারেন না। তবে স্ত্রীর স্বেচ্ছাপ্রণোদিত মওকুফ গ্রহণযোগ্য। আইনসংগত বিয়ের ক্ষেত্রে মোহর বিলম্বিত করার কোনো সুযোগ নেই।
আদালত বলেছেন, স্ত্রী দাবি করলে বিলম্বিত দেনমোহর তাৎক্ষণিকভাবে দিতে হবে। বিয়ের চুক্তি ও মুসলিম আইন অনুসারে, অবিলম্বে বা চাহিদা মোতাবেক সেই দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ওই দম্পতির বিয়ে হয় ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর। বিয়ের সময় পরিবারের উপস্থিতিতে ২২ লাখ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়েছিল। ওই দম্পতির একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। স্বামী যৌতুক দাবি করেন। এ নিয়ে মনোমালিন্যের একপর্যায়ে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।
জানা যায়, স্ত্রী দেনমোহর ও সন্তানের ভরণপোষণের দাবিতে চট্টগ্রামের পারিবারিক আদালতে মামলা করেন। স্বামী আদালতে হাজির হননি। পারিবারিক আদালত ২০২২ সালের ৫ মে একতরফা সিদ্ধান্ত (ডিক্রি) দেন।
রায়ে স্ত্রীকে ১৮ লাখ টাকা দেনমোহর, ইদ্দতকালীন তিন মাসের ভরণপোষণ বাবদ ৩০ হাজার টাকা ও কন্যাশিশুর বকেয়া ভরণপোষণ বাবদ ২ লাখ ১০ হাজার টাকা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ডিক্রির অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। পাশাপাশি কন্যাশিশুর বিয়ের আগপর্যন্ত প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা ভরণপোষণ দিতেও বলা হয়।
ওই মামলার ধারাবাহিকতায় ডিক্রি বাতিল চেয়ে অধস্তন আদালতে আবেদন করে বিফল হন স্বামী। এরপর পারিবারিক আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেন, যা ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট খারিজ হয়। এর বিরুদ্ধে ওই বছরই হাইকোর্টে রিভিশন আবেদনটি করেন স্বামী।
এতে তিনি দাবি করেন, ব্যবসা হারোনোর কারণে গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়েছেন। এককালীনভাবে প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তাঁকে দেনমোহরের অর্থ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হোক। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল দেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে রুল খারিজ করে গত ৩ সেপ্টেম্বর রায় দেন।
রায়ে হাইকোর্ট আইন অনুযায়ী বকেয়া দেনমোহর ও অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার প্রাপ্য ভরণপোষণের সব বকেয়া পরিশোধ করে ডিক্রি বাস্তবায়ন করতে স্বামীকে নির্দেশ দিয়েছেন।
ভোরের আকাশ/ইউএম