গাইবান্ধায় শিশু দিবসের অনুষ্ঠানে শিশু অধিকারের ডাক

সন্ধ্যা নামতেই আলোয় ঝলমল করে উঠল গাইবান্ধা নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংস্থার ডা. সাখাওয়াত হোসেন খান মুক্ত মঞ্চ। দর্শকসারিতে তখন কৌতূহলী নীরবতা। মঞ্চে একে একে উঠে আসছে শিশুরা। কেউ সঞ্চালক, কেউ স্বাগত বক্তা, কেউ গাইছে গান, কেউ আবৃত্তি করছে, আবার কেউ নৃত্যে মাতিয়ে তুলছে পুরো মঞ্চ। বড়দের জায়গা সেদিন শুধু দর্শকসারিতে।
শিশুদের এমন ব্যতিক্রমী অংশগ্রহণে গতসোমবার সন্ধ্যায় জমে ওঠে বিশ্ব শিশু দিবসের আয়োজন। ‘আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী গাইবান্ধা পরিচালিত সত্যেন সেন সংগীত বিদ্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় অনুষ্ঠানটি।
পুরো অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা, পরিচালনা ও বিভিন্ন পরিবেশনার দায়িত্ব ছিল বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে সন্ধি, অবনী ও মৈত্রী।
শিশুসুলভ সরলতা আর আত্মবিশ্বাসে তারা একের পর এক পরিবেশনার নাম ঘোষণা করে এগিয়ে নেয় অনুষ্ঠান। স্বাগত বক্তব্য দেন শিক্ষার্থী পরমব্রত। তার আন্তরিক বক্তব্যের মধ্য দিয়েই শুরু হয় সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আনুষ্ঠানিকতা।
এরপর একে একে মঞ্চে আসে সম্মিলিত গান, নজরুলসংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্য। এসব পরিবেশনায় অংশ নেয় তরী, দিপান্বিতা, প্রার্থনা, সন্ধি, শামস, রাশিন ও নভোনীলসহ বিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী। শিশুদের কণ্ঠের সম্মিলিত সুর, আবৃত্তির ছন্দ আর নৃত্যের তালে বারবার করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে দর্শকসারি।
অনুষ্ঠানের শিরোনামেও ছিল জাগরণের আহ্বান 'আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে’। সেই আহ্বান শুধু গানের চরণে সীমাবদ্ধ থাকেনি; শিশুদের পরিবেশনা ও অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তা যেন ছড়িয়ে পড়ে উপস্থিত দর্শকদের মাঝেও।
এবারের বিশ্ব শিশু দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘শিশুদের কথা শুনুন, প্রতিটি শিশুর অধিকার রক্ষায় প্রতিদিন সোচ্চার হোন’। এই বার্তাকে সামনে রেখে অনুষ্ঠানে শিশুদের অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সার্বিক বিকাশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বিশেষ করে, পুরো আয়োজনের নিয়ন্ত্রণ যখন শিশুদের হাতেই ছিল, তখন প্রতিপাদ্যের ‘শিশুদের কথা শুনুন’ এই আহ্বানটি যেন বাস্তব রূপ পায়। সেদিন মঞ্চে বড়দের দায়িত্ব ছিল শুধু শোনা, আর শিশুদের দায়িত্ব ছিল নিজেদের কথা বলা।
অনুষ্ঠান শেষে সত্যেন সেন সংগীত বিদ্যালয়ের পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ, সুন্দর, বৈষম্যহীন ও শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। শিশুদের কথা শোনা এবং তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
উদীচী গাইবান্ধা জেলা সংসদের সভাপতি, লেখক ও গবেষক জহুরুল কাইয়ুম বলেন, শিশুদের প্রতি সমাজ ও রাষ্ট্রকে আরও যত্নশীল হতে হবে। তাদের সুস্থ, স্বাভাবিক ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
আয়োজকদের মতে, এটি শুধু একটি দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। গান, আবৃত্তি ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে শিশুদের প্রতিভা ও সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটেছে। একই সঙ্গে মঞ্চ পরিচালনা ও অনুষ্ঠানের বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তারা পেয়েছে আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা।
শৈশব থেকেই সংস্কৃতির সঙ্গে শিশুদের সম্পৃক্ততা তাদের মানবিক, সৃজনশীল ও সচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলেও মনে করেন আয়োজকেরা।
রাত গভীর হতে শুরু করলেও মুক্ত মঞ্চে তখনো ছিল শিশুদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি। শেষ পর্যন্ত করতালির মধ্য দিয়ে পর্দা নামে আয়োজনের। তবে অনুষ্ঠান শেষ হলেও দর্শকদের মনে থেকে যায় একটি বার্তা শিশুরা শুধু ভবিষ্যৎ নয়, তারা আজকেরও অংশ। তাদের কথা শুনতে হবে, অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আর শিশুরা যদি জেগে ওঠে, তাহলে সকাল ঠিকই হবে।
ভোরের আকাশ/ইউএম