ইতালির স্কুলে বোরকা-নিকাব নিষিদ্ধ, বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যায় লাগাম

ইতালির স্কুলগুলোতে বোরকা ও নিকাব পরা নিষিদ্ধ এবং প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশে সীমিত করার একটি অধ্যাদেশ (ডিক্রি-ল) অনুমোদন করেছে দেশটির সরকার।
প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মন্ত্রিসভা বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) এই সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন এই নিয়মটি আগামী বছর থেকে কার্যকর হবে এবং এটি পুরোপুরি কার্যকর রাখতে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ইতালীয় পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
তবে এটি এখনো স্থায়ী আইন নয়। ডিক্রি-ল জারি হওয়ার পর তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হতে পারে, কিন্তু ৬০ দিনের মধ্যে ইতালির পার্লামেন্টকে তা অনুমোদন করতে হবে। প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাতারেল্লারও এতে স্বাক্ষর করতে হবে।
মাতারেল্লা চলতি সপ্তাহেই শিক্ষাক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধা তৈরি হতে পারে- এমন পদক্ষেপ নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন।
রোববার নিজের দল ব্রাদার্স অব ইতালির (এফডিআই) যুব শাখার এক অনুষ্ঠানে নতুন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন মেলোনি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ইতালীয় ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করা ও স্কুলে বোরকা-নিকাব ‘বন্ধ করার’ ব্যবস্থা নেওয়া এমন কিছু ‘সাধারণ বোধের’ পদক্ষেপ, যা সমাজকে বিভক্ত করে না।
মেলোনি লিখেছেন, আমরা যে পথে এগিয়ে যেতে চাই তা হলো- এমন একটি স্কুল, যা নিয়ম বিসর্জন না দিয়ে একীভূত করে, যাদের বেশি অসুবিধা তাদের সহায়তা করে ও সবাইকে একই জায়গা থেকে শুরু করার সুযোগ দেয়।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর অতিরিক্ত ঘনত্ব কমাতে স্থানীয় স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন স্কুলে ভাগ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে।
৩০ শতাংশ সীমা নিয়ে কী বলছে সরকার?
শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা জানিয়েছেন, নতুন নিয়মের কারণে আনুমানিক ১ হাজার শ্রেণিকক্ষ প্রভাবিত হতে পারে। এটি সারা দেশের মোট শ্রেণিকক্ষের প্রায় ০.৩ শতাংশ। কোনো স্কুলে ৩০ শতাংশ সীমা বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলে বিশেষ ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি এসব স্কুলকে অতিরিক্ত ভাষা সহায়তার জন্য অর্থ দেওয়া হবে।
সরকারের যুক্তি হলো, একই শ্রেণিকক্ষে অ-ইতালীয় ভাষাভাষী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলে ইতালীয় ভাষা শেখার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন শ্রেণি ও স্কুলে ছড়িয়ে দিয়ে ভাষাগত একীভূতকরণে সহায়তা করাই নতুন ব্যবস্থার লক্ষ্য।
ইতালির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে দেশটির স্কুলগুলোতে অ-ইতালীয় নাগরিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মোট শিক্ষার্থীর ১১.২ শতাংশ। আর ৩০ শতাংশের বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী থাকা শ্রেণিকক্ষের সংখ্যা ছিল মোট শ্রেণিকক্ষের ৭.৬ শতাংশ।
শিক্ষক ও স্কুলপ্রধানদের আপত্তি
সরকারের উদ্যোগ নিয়ে ইতালির শিক্ষক ইউনিয়নগুলো সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, নতুন নিয়ম চালুর আগে পর্যাপ্ত আলোচনা করা হয়নি ও প্রয়োজনীয় সম্পদের বিষয়টিও পরিষ্কার নয়।
স্কুলপ্রধানদের মধ্যেও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি, সেখানে ৩০ শতাংশ সীমা কীভাবে কার্যকর করা হবে- তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তারা।
ইতালির ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব প্রিন্সিপালসের সভাপতি আন্তোনেল্লো জিয়ানেল্লি বলেন, শিক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি যৌক্তিক ও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটিকে বাস্তবসম্মত সমাধানে রূপ দেওয়া কঠিন।
বিরোধীদের সমালোচনা
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, মেলোনি সরকার আগামী বছরের নির্বাচনের আগে ডানপন্থী ও কট্টর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জনপ্রিয়তা মোকাবিলায় এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা রবার্তো ভান্নাচ্চির নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী ন্যাশনাল ফিউচার (এফএন) পার্টি স্কুল ও অভিবাসন ইস্যুকে তাদের রাজনৈতিক প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করেছে। দলটি ‘রিমাইগ্রেশন’ বা অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরানোর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। জুলাইয়ে স্কুলে বোরকা নিষিদ্ধ করার দাবিও তুলেছিল তারা।
মেলোনির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে মধ্য-বাম ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডি) নেতা এলি শ্লেইন বলেন, সরকার শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সমস্যা সমাধানের বদলে ‘সংস্কৃতি-যুদ্ধের রাজনীতি’কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
তিনি নতুন উদ্যোগকে ‘লজ্জাজনক ডিক্রি’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সরকারি স্কুলব্যবস্থার প্রকৃত সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা আড়াল করতেই নতুন একটি ‘আদর্শিক ব্যানার’ ব্যবহার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, মেলোনি সরকারের অবস্থান হলো, ভাষা শেখানো ও স্কুলে অভিন্ন নিয়ম নিশ্চিত করা শিক্ষার্থীদের আরও ভালোভাবে একীভূত হতে সাহায্য করবে।
নতুন ডিক্রি এখন পার্লামেন্টের অনুমোদনের অপেক্ষায়। ফলে আগামী বছর থেকে ইতালির স্কুলগুলোতে বোরকা-নিকাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং অ-ইতালীয় ভাষাভাষী শিক্ষার্থীদের ৩০ শতাংশ সীমা কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করছে পার্লামেন্টের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
ভোরের আকাশ/আ.র