নিজেদের ড্রোনের আঘাতে প্রাণ গেলো দুই ইসরায়েলি সেনার

উত্তর গাজায় নিজেদের পরিচালিত একটি বিস্ফোরকবাহী ড্রোন বিধ্বস্ত ও বিস্ফোরিত হয়ে দুই ইসরায়েলি রিজার্ভ সেনা নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) এই দুর্ঘটনাটি ঘটে এবং ২৫ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্যটি নিশ্চিত করে।
নিহত সেনাসদস্যদের নাম মাস্টার সার্জেন্ট (রিজার্ভ) নাদাভ কালি (২৪) ও মাস্টার সার্জেন্ট (রিজার্ভ) ওফেক মোয়ালেম (২৩) বলে জানানো হয়েছে। তারা উভয়েই আইডিএফের জেরুজালেম ব্রিগেডের ৭০০৭তম ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন।
সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তের বরাতে জানা গেছে, গাজার উত্তরাঞ্চলে সীমান্তসংলগ্ন ইসরায়েলি সামরিক পোস্টে অবস্থান করে ওই দুই সেনা হিব্রু ভাষায় ‘আতালেফ’ (যার অর্থ বাদুড়) নামে পরিচিত ‘ফার্স্ট-পারসন ভিউ’ (এফপিভি) ড্রোন পরিচালনা করছিলেন।
প্রথম ড্রোনটি সফলতা ও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে মিশন সম্পন্ন করলেও দ্বিতীয় ড্রোনটি উড্ডয়নের পরপরই অজানা কারণে ক্যাম্পের ভেতরেই ভেঙে পড়ে। দুর্ঘটনাটি ঘটার কয়েক মিনিট পর সেনাসদস্য দুজন ড্রোনটির কাছে গিয়ে তা হাত দিয়ে তোলার চেষ্টা করতেই তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে, যার ফলে তারা গুরুতর আহত হন।
পরে তাদের উদ্ধার করে আশকেলনের বারজিলাই মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তাদের মৃত ঘোষণা করেন দায়িত্বরত চিকিৎসকেরা।
এই প্রাণঘাতী বিস্ফোরণ ও ড্রোনটি ভেঙে পড়ার মূল কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করেছে সামরিক কর্তৃপক্ষ। দুর্ঘটনাটি তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় সকল ধরনের বিস্ফোরক বহনে সক্ষম ছোট আকারের ড্রোন (আত্মঘাতী ড্রোন ও লক্ষ্যবস্তুতে বিস্ফোরক ফেলার ড্রোন)- উভয়ের ব্যবহারই সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি পুনর্বিবেচনা করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধানে ইসরায়েল সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ লেফট্যানেন্ট জেনারেল আইয়াল জামির একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। পদাতিক বাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের নেতৃত্বে এই তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সুপারিশ করবে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর গাজা উপত্যকায় শুরু হওয়া ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের জেরে অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা এখনো ইসরায়েলি বাহিনীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিরতি ও হামাসের সক্ষমতা পুনঃগঠন ঠেকাতে মাঝেমধ্যেই হামলা চালিয়ে যাচ্ছে আইডিএফ।
কয়েক মাসের টানা আলোচনার পর চলতি বছরের ৩০ জুলাই হামাস যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ‘বোর্ড অফ পিস’-এর দেওয়া নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সম্মত হয়েছিল। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর আপত্তির কারণে বিষয়টি স্থবির হয়ে পড়ে। নেতানিয়াহুর দাবি, হামাসকে পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ না করা পর্যন্ত আইডিএফ গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না।
‘বোর্ড অব পিস’-এর কর্মকর্তারা মনে করছেন, আগামী ২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতানিয়াহু এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছেন না, ফলে নির্বাচনের আগে এই ইস্যুতে অগ্রগতির সম্ভাবনা ক্ষীণ।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার এই যুদ্ধে গাজায় এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও ১ হাজার ৩৩০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক মূল্যায়নেও গাজার সামগ্রিক এই মৃত্যুসংখ্যা অনেকটাই সঠিক বলে ধারণা করা হয়, যেখানে প্রতিজন সশস্ত্র যোদ্ধার বিপরীতে ২ থেকে ৩ জন সাধারণ নাগরিক মারা গেছেন বলে তাদের অনুমান।
ভোরের আকাশ/আ.র