চীনের শেয়ারবাজারে ২০ শতাংশ পতন, চাপে প্রযুক্তি খাত ও অর্থনীতি

চীনের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। দেশটির প্রধান শেয়ারবাজার সূচক ‘সিএসআই ৩০০’ গত জুনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।
গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সূচকটি একপর্যায়ে ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে যায়। এতে সূচকটি ‘বিয়ার মার্কেট’ বা নিম্নমুখী বাজারের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
সাংহাই ও শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত ৩০০টি বড় প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর নিয়ে সিএসআই ৩০০ সূচক গঠিত। সাধারণত সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কোনো শেয়ারবাজার সূচক ২০ শতাংশ কমে গেলে সেটিকে বিয়ার মার্কেট হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
চীনের শেয়ারবাজারে এই পতনের পেছনে তিনটি বিষয় কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাত নিয়ে বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত প্রত্যাশা কমে যাওয়া, অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় দুর্বল থাকা এবং সরকারের নতুন প্রণোদনা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাজারে চাপ তৈরি করেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
চীনের প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে চলতি বছরের শুরুতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছিল।
এআই প্রযুক্তিতে চীনের অগ্রগতি এবং এই খাতকে এগিয়ে নিতে বেইজিংয়ের উদ্যোগের কারণে শেয়ারগুলোর দর বাড়ে।
তবে এখন বিনিয়োগকারীরা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আয়, মুনাফার সম্ভাবনা এবং শেয়ারের মূল্যায়ন নিয়ে বেশি সতর্ক। প্রযুক্তি খাত নিয়ে প্রত্যাশা দ্রুত বাড়লেও সেই তুলনায় মুনাফা না বাড়লে শেয়ারের দামে বড় ধরনের সংশোধন হতে পারে।
চীনের বাইরেও এআই-সংশ্লিষ্ট শেয়ারে বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে। এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।
চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নে অনেক প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। দরপতন দীর্ঘস্থায়ী হলে তাদের অর্থ সংগ্রহ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
চীনের অর্থনীতিতে আরেকটি উদ্বেগের জায়গা হলো সাধারণ মানুষের ব্যয়। দেশটির পরিবারগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে কেনাকাটা করছে না—এমন আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে। ভোগব্যয় দুর্বল থাকলে খুচরা বিক্রেতা, ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা প্রতিষ্ঠান এবং ভোক্তানির্ভর ব্যবসাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কিংবা বাজারে শক্ত অবস্থান থাকা সত্ত্বেও এসব প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ক্রেতাদের ব্যয় করার সক্ষমতা ও আগ্রহ প্রয়োজন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের তৃতীয় প্রান্তিকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ছিল। এতে দেশটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পূরণের সম্ভাবনা বজায় রয়েছে। ফলে সরকার বড় ধরনের নতুন প্রণোদনা প্যাকেজের পরিবর্তে নির্দিষ্ট খাতে সহায়তা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তবে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ আর ব্যবসা-বাণিজ্যের সার্বিক উন্নতি এক বিষয় নয়। বিনিয়োগকারীরা ভোগব্যয় বৃদ্ধি, প্রতিষ্ঠানের মুনাফার উন্নতি এবং মানুষের ব্যয় করার আত্মবিশ্বাস বাড়ার স্পষ্ট প্রমাণ দেখতে চান।
চীনের শেয়ারবাজারে আগের উত্থানের পেছনে সরকারের নীতিগত সহায়তার প্রত্যাশা বড় ভূমিকা রেখেছিল। অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সরকার বড় পদক্ষেপ নেবে—এমন ধারণা থেকে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছিল। কিন্তু নতুন করে বড় ধরনের প্রণোদনা দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সরকারের সীমিত সহায়তা অর্থনীতির গতি ফেরাতে যথেষ্ট হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বাজারে বিক্রির চাপ কমাতে এবং শেয়ারের দর স্থিতিশীল রাখতে চীনা কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে সরকারি সহায়তায় শেয়ারের দর সাময়িকভাবে স্থিতিশীল হলেও তা দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের নিশ্চয়তা দেয় না।
এর মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাটারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কনটেম্পোরারি অ্যাম্পেরেক্স টেকনোলজি (সিএটিএল) প্রান্তিক মুনাফা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। বুধবার প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দর ১২ শতাংশ কমে যায়। খাতটিতে নীতিগত সহায়তা কমে আসাও চাপের একটি কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেয়ারের দাম ২০ শতাংশ কমলে বাজারকে তুলনামূলক সস্তা মনে হতে পারে। তবে দরপতন হলেই কোনো শেয়ার আকর্ষণীয় বিনিয়োগে পরিণত হয় না। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ভিলওয়ারিয়াফিনসার্ভের অংশীদার অভিষেক ভিলওয়ারিয়া এনডিটিভিকে বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, করপোরেট মুনাফা ও সরকারি নীতির প্রত্যাশা পূরণ না হলে বিনিয়োগকারীদের মনোভাব দ্রুত বদলে যেতে পারে। চীনের দুর্বল অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়, বড় প্রণোদনার আশা কমে যাওয়া এবং প্রযুক্তি খাত নিয়ে অনিশ্চয়তা বাজারের ওপর চাপ তৈরি করছে।
তার মতে, শেয়ারের মূল্যায়ন কমে যাওয়ায় চীনের কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ার আকর্ষণীয় হতে পারে। তবে শুধু বাজারের সংশোধনকে বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। প্রতিষ্ঠানের আয় টেকসইভাবে বাড়ছে কি না, চাহিদা শক্তিশালী হচ্ছে কি না এবং ব্যবসার মৌলিক অবস্থা উন্নত হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
তিনি বিনিয়োগে বৈচিত্র্য রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে যেসব বাজারে সরকারি নীতি ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিনিয়োগের মুনাফায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে, সেখানে একক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
চীনের শেয়ারবাজারে টেকসই পুনরুদ্ধার নির্ভর করবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসা, কম্পানিগুলোর মুনাফা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বাস্তব উন্নতির ওপর। সাময়িক দরবৃদ্ধি দিয়ে সেই পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা যাবে না।
ভোরের আকাশ/ এনউব