কী, কেন, কীভাবে
গাজার আদলে লেবাননে ইসরায়েলের ‘ইয়েলো লাইন’

লেবাননে ইসরায়েলের তীব্র হামলার পর ১০ দিনের যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে, তা ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর সংশয়। যুদ্ধবিরতির শর্তের মধ্যেই ইসরায়েলি বাহিনীর নতুন করে হামলা এবং গাজার আদলে লেবাননের অভ্যন্তরে ‘ইয়েলো লাইন’ বা সামরিক অঞ্চল তৈরির উদ্যোগ যুদ্ধবিরতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতে ৪৬ দিনের ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ ও স্থল অভিযানের পর এই যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। তবে যুদ্ধবিরতি শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লেবাননের সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর ঘরবাড়ি ধ্বংস, গোলাবর্ষণ এবং জমি দখলের মতো কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে।
‘ইয়েলো লাইন’ আসলে কী?
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তাদের বাহিনী লেবাননে একটি ‘শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয়’ বা বাফার জোনে অবস্থান করছে। তিনি বলেন, ‘এটি ১০ কিলোমিটার গভীর একটি নিরাপত্তা অঞ্চল, যা আমাদের আগের যেকোনও অবস্থানের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও স্থায়ী। আমরা সেখানেই আছি এবং সেখান থেকে সরে যাচ্ছি না।’
এই লাইনটির সঙ্গে গাজার পরিস্থিতির তুলনা করা হচ্ছে। গাজায় ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে বিভক্ত করে ফেলেছে, যেখানে ছিটমহলটির ৬০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। বাকি এলাকায় বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের ঠাসাঠাসি করে রাখা হয়েছে। গাজার ওই বাফার জোনে কেউ প্রবেশ করলেই ইসরায়েলি বাহিনী গুলি চালায় এবং সেখানে শত শত ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে। গত অক্টোবরে মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পরও সেখানে ইসরায়েলি হামলায় ৭০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ২ হাজার মানুষ আহত হয়েছে।
ইসরায়েল কেন চায়?
এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ইসরায়েলের ঘোষিত ‘ইয়েলো লাইন’। এটি মূলত দক্ষিণ লেবাননের অভ্যন্তরে সীমান্ত থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার (৬ মাইল) পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সামরিক অঞ্চল। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দাবি, তারা এই এলাকাটি নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় এবং হিজবুল্লাহকে নির্মূল করার অজুহাতে সেখানে হামলার অধিকারও সংরক্ষণ করে। লেবানন ও হিজবুল্লাহ এই পদক্ষেপকে সার্বভৌম ভূখণ্ডে দখলদারত্ব হিসেবে আখ্যা দিয়ে যুদ্ধবিরতির মূল ভিত্তির লঙ্ঘন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
কীভাবে তৈরি হবে?
শনিবার এক ব্রিফিংয়ে জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “গাজায় বাস্তবায়িত ‘ইয়েলো লাইন’ মডেলটি লেবাননেও প্রয়োগ করা হবে; ইসরায়েলি বাহিনী (আইডিএফ) ইতোমধ্যে একটি ‘ইয়েলো লাইন’ তৈরি করেছে এবং এর সেনারা বর্তমানে সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।”
কর্মকর্তারা আরও জানান, ওই অঞ্চলের ৫৫টি লেবানিজ শহর ও গ্রামে বাসিন্দাদের ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া হবে না। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ শুক্রবার ঘোষণা দিয়েছেন যে, তাদের বাহিনী ‘যেসব অবস্থান থেকে হিজবুল্লাহকে সরিয়ে সুরক্ষিত করেছে, তার সবটুকু ধরে রাখবে ও নিয়ন্ত্রণ করবে।’
যুদ্ধবিরতির শর্তাবলী নিয়ে মতভেদ?
যুদ্ধবিরতির শর্তাবলী নিয়ে শুরু থেকেই মতভেদ দেখা দিয়েছে। চুক্তির বয়ানে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ও লেবানন ‘শত্রুতা বন্ধ রাখবে’। কিন্তু পরে আবার বলা হয়েছে, ইসরায়েল ‘যেকোনও সময় আত্মরক্ষার খাতিরে পরিকল্পিত, আসন্ন বা চলমান হামলার বিরুদ্ধে সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে।’
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাগুলোতে ব্যাপক অস্পষ্টতা ও স্ববিরোধিতা রয়েছে। আল-জাজিরার বেইরুত প্রতিনিধি হেইডি পেট বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত শর্তাবলী ইসরায়েলকে তাদের নিজস্ব সংজ্ঞায় ‘আত্মরক্ষার’ অজুহাতে যেকোনও পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। হেইডি পেট বলেন, “ইসরায়েল আত্মরক্ষার সংজ্ঞাটিকে বেশ বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করছে। কেবল আসন্ন বা চলমান হুমকি নয়, বরং ‘পরিকল্পিত’ হুমকির ক্ষেত্রেও তারা হামলার সুযোগ রাখছে।”
তিনি আরও জানান, ইসরায়েলি বাহিনী লেবানিজ গ্রামে ঘরবাড়ি ধ্বংস, গোলাবর্ষণ ও ‘ইয়েলো লাইন’ বা তার কাছাকাছি এলাকায় মেশিনগান দিয়ে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। আল-জাজিরার সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, শনিবার হানিয়েন শহরে ইসরায়েলি বাহিনী ঘরবাড়ি উড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া বেইত লিফ, আল-কান্তারা ও তৌলে গোলাবর্ষণ করা হয়েছে।
হিজবুল্লাহর প্রতিক্রিয়া ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
শনিবার লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলায় এক ফরাসি সেনা নিহত ও তিনজন আহত হওয়ার ঘটনায় হিজবুল্লাহর দিকে আঙুল তোলা হয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এ জন্য হিজবুল্লাহকে দায়ী করলেও গোষ্ঠীটি দায় অস্বীকার করেছে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে ‘আমাদের দেশের জন্য অপমান’ এবং ‘অন্তহীন এক পিচ্ছিল পথ’ বলে নিন্দা জানিয়েছে হিজবুল্লাহ। গোষ্ঠীটি বলেছে, ‘যুদ্ধবিরতি মানে সব ধরনের শত্রুতার সম্পূর্ণ অবসান। আমরা এই শত্রুকে বিশ্বাস করি না, তাই প্রতিরোধ যোদ্ধারা মাঠে থাকবে এবং আগ্রাসনের যেকোনও লঙ্ঘনের জবাব দিতে প্রস্তুত থাকবে। যুদ্ধবিরতি একতরফা হতে পারে না, এটি অবশ্যই পারস্পরিক হতে হবে।’
হিজবুল্লাহ আরও জানিয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের ভূখণ্ড থেকে পুরোপুরি সীমান্ত পর্যন্ত সরে না যাওয়া পর্যন্ত তারা মোতায়েন থাকবে।
এরই মধ্যে হিজবুল্লাহ এই যুদ্ধবিরতিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। আগামী দিনগুলোতে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার কথা রয়েছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, লেবাননে যুদ্ধবিরতি তাদের আলোচনার অগ্রগতির পূর্বশর্ত এবং সেখানে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে তা দুই দেশের মধ্যকার শান্তি প্রক্রিয়াকে বিপন্ন করবে।
লেবানন সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে সমান্তরাল আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যাকে হিজবুল্লাহ ‘অপমান’ ও ‘লজ্জাজনক দৃশ্য’ বলে সমালোচনা করেছে। হিজবুল্লাহর নিরস্ত্র হওয়ার বিষয়ে ইসরায়েল ও লেবানিজ কর্মকর্তারা চাপ দিলেও গোষ্ঠীটি বলছে, লেবানন ও দক্ষিণাঞ্চলের সুরক্ষায় তাদের অস্ত্র অপরিহার্য। তারা ইসরায়েলের আগের যুদ্ধবিরতি চুক্তিগুলোর ব্যর্থতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছে, ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের ভূখণ্ড ছাড়েনি, তাই অস্ত্র সমর্পণের প্রশ্নই আসে না।
স্থায়ী দখলের ভয়
রাজনৈতিক ভাষ্যকার আবেদ আবু শাহাদেহ আল-জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েলের নতুন এই কৌশল কেবল লেবানন নয়, সিরিয়াতেও দেখা যাচ্ছে, যার লক্ষ্য আঞ্চলিক প্রসারের মাধ্যমে ক্ষমতা সুসংহত করা। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতের যেকোনও আলোচনায় ইসরায়েল এই ভূখণ্ডগুলো নিজেদের দখলে রেখে দরকষাকষির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চাইবে।’
ইতিহাস বলছে, ২০০০ সালে লেবানন থেকে সরে যাওয়ার আগে ইসরায়েল বছরের পর বছর দক্ষিণ লেবানন দখল করে রেখেছিল। এখনও তারা শেবা ফার্মস এলাকা এবং সিরিয়ার গোলান মালভূমি ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে।
অনেক লেবানিজদের আশঙ্কা, যুদ্ধবিরতির আড়ালে এই সামরিক অঞ্চলটি হয়তো স্থায়ী দখলে পরিণত হতে যাচ্ছে। সমালোচকদের মতে, যতদিন ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের ভেতরে থাকবে এবং সামরিক অভিযান চলতে থাকবে, ততদিন এই যুদ্ধবিরতি কেবল দখলের বৈধতা দেওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবেই গণ্য হবে।
ভোরের আকাশ/এনএস