হামে বিপর্যস্ত মেক্সিকো, করোনার চেয়েও দ্রুত সংক্রমণ

গত বছরের শুরুর দিকে মেক্সিকোর নয় বছর বয়সী এক শিশু বাবা-মায়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের সেমিনোল শহরে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যায়। কয়েকদিন পর তারা মেক্সিকোর চিয়ুয়াহুয়ায় নিজ বাড়িতে ফিরে আসে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই শিশুটির শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। এরপর কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তার স্কুলের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়লে বাধ্য হয়ে স্কুলটি বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
পরিবারটি তখনও জানত না, তাদের সফরের সময় সেমিনোলে নীরবে ছড়িয়ে পড়ছিল হামের সংক্রমণ। অল্প সময়ের মধ্যেই শহরটি গত তিন দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এতে তিন মার্কিন নাগরিকের মৃত্যু হয়। তবে ভাইরাসটি সীমান্ত পেরিয়ে মেক্সিকোয় পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
মেক্সিকোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে হামের জটিলতায় অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে রয়েছে শিশু থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী খামারশ্রমিকও। একই সময়ে দেশটিতে ১৭ হাজারের বেশি মানুষ হামে আক্রান্ত হয়েছেন, যা প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। অথচ মাত্র দুটি টিকা নিলেই এ রোগ পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব। আক্রান্তদের বেশিরভাগই টিকা নেননি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচিতে সামান্য অবহেলা বা ঘাটতি কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, মেক্সিকোর বর্তমান পরিস্থিতি তার বড় উদাহরণ।
টেক্সাস থেকে মেক্সিকো : প্রথমে টেক্সাস সীমান্তসংলগ্ন চিয়ুয়াহুয়া রাজ্যের মেনোনাইট খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কৃষিভিত্তিক এলাকায় রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। পরে তা মৌসুমি আদিবাসী খামারশ্রমিকদের মধ্যেও দ্রুত বিস্তার লাভ করে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ শুধু এই রাজ্যেই সাড়ে চার হাজার আক্রান্ত শনাক্ত হয়, যা পুরো যুক্তরাষ্ট্রের মোট আক্রান্তের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায়।
মেক্সিকোর ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা গেছে, আক্রান্তদের শরীর থেকে সংগৃহীত শতাধিক নমুনার জিনগত বৈশিষ্ট্য ২০২৪ সালে কানাডা ও পরবর্তীতে টেক্সাসে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসের সঙ্গে মিলে গেছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহামারি তথ্য বিভাগের পরিচালক ড. মিগুয়েল নাকামুরা বলেন, চিয়ুয়াহুয়ার এই প্রাদুর্ভাব থেকেই মূলত সারা দেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।
করোনার চেয়েও বেশি ছোঁয়াচে : চিকিৎসকদের মতে, হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ, যা করোনাভাইরাসের চেয়েও দ্রুত ছড়াতে সক্ষম। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি কিংবা কথা বলার মাধ্যমেও ভাইরাসটি বাতাসে প্রায় দুই ঘণ্টা ভেসে থাকতে পারে। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারেন।
মেক্সিকোর ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটির মহামারি বিশেষজ্ঞ স্যামুয়েল পনস দে লিওন বলেন, দীর্ঘদিন টিকার সফল ব্যবহারের কারণে মানুষ পোলিও বা হামের মতো রোগের ভয়াবহতা ভুলে গিয়েছিল। মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২৫ বছর আগে হামমুক্ত হয়েছিল। ফলে অনেকেই টিকার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উদাসীন হয়ে পড়ে।
টেক্সাসের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো সেমিনোলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাবিরোধী নানা অপপ্রচার ছড়ায়। অন্যদিকে মেক্সিকোয় সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সমন্বয়হীনতা ও বাজেট সংকটের কারণে টিকাদানের হার ৮০ শতাংশের নিচে নেমে যায়। চিয়ুয়াহুয়ার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ড. হুগো কোভিয়ান জানান, কেন্দ্রীয় সরকার থেকে পর্যাপ্ত টিকা না পাওয়ায় সময়মতো সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
জনসাধারণের মাঝে উদ্বেগ : চিয়ুয়াহুয়ার কুয়াউতেমক শহরের ‘এসপেরানজা’ মেনোনাইট স্কুলের প্রধান শিক্ষক অস্কার পিটার্স জানান, শুরুতে স্থানীয় চিকিৎসকেরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যে স্কুলের এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে ভাইরাসটি দরিদ্র ও অপুষ্টিতে ভোগা আদিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে ওঠে। জুনের শুরুতে চার বছরের এক শিশুসহ চিয়ুয়াহুয়ায় ২১ জনের মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে ১৭ জনই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য।
ক্ষতিগ্রস্তদের একজন আন্দ্রেস বার্গেন জানান, তার চার সন্তানই হামে আক্রান্ত হয়ে তীব্র জ্বর ও শ্বাসকষ্টে ভুগেছে। তারা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যায়। তিনি বলেন, “আমরা ভাবতাম হাম অতীতের রোগ। কোভিডের পর চিকিৎসকদের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি হওয়ায় সন্তানদের টিকা দিইনি।”
অস্কার পিটার্স আরও জানান, কিছু অভিভাবক ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুদের আক্রান্ত করার পরামর্শও দিয়েছিলেন, যাতে তাদের শরীরে প্রাকৃতিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়।
জরুরি টিকাদান কর্মসূচি : পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মেক্সিকোর স্বাস্থ্য বিভাগ জরুরি পদক্ষেপ নেয়। মেনোনাইট সম্প্রদায়ের ভাষা ‘লো জার্মান’-এ সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হয়। পাশাপাশি চিয়ুয়াহুয়া রাজ্যের প্রায় অর্ধেক মানুষকে টিকার আওতায় আনা হয়।
তবে চলতি বছরের শুরুতে সংক্রমণের কেন্দ্র দক্ষিণের বাণিজ্যিক ও কৃষি অঞ্চল জলিস্কো রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে, রাজ্যের রাজধানী গুয়াদালাজারার স্কুল-কলেজে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়। আগামী জুনে অনুষ্ঠেয় ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক শহর এটি।
সংক্রমণ ঠেকাতে মেক্সিকো সরকার দেশজুড়ে রেকর্ড ২৫ কোটি ডোজ টিকা প্রয়োগ করেছে। ব্যাপক টিকাদানের ফলে বর্তমানে মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশেই সংক্রমণের হার অনেকটাই কমেছে।
তবে জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের মহামারি বিশেষজ্ঞ ড. উইলিয়াম মস সতর্ক করে বলেন, “মেক্সিকো বা যুক্তরাষ্ট্রে হামের ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়নি। এখনও দুই দেশেই এমন অনেক জনগোষ্ঠী রয়েছে যারা টিকা নেয়নি। ফলে যে কোনো সময় নতুন করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।” সূত্র: সিএনএন
ভোরের আকাশ/সু.পা