শুভেন্দু-ঋতব্রত বৈঠকের পর তৃণমূলে বড় ভাঙনের ইঙ্গিত

ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেসে নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ সংকট দেখা দিয়েছে। দিল্লির পশ্চিমবঙ্গ ভবনে একটি সংক্ষিপ্ত বৈঠককে কেন্দ্র করে এই সংকটের সূত্রপাত হয় বলে জানা গেছে। ওই ঘটনার মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে দলের প্রায় ৬০ জন বিধায়ক বিদ্রোহ ঘোষণা করে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় নতুন নেতৃত্বের দাবি তোলেন।
গত ২২ মে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জীর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ভবনে একটি সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে এই সাক্ষাৎকে ঘিরে দলের ভেতরে রাজনৈতিক জল্পনা ও অস্বস্তি বাড়তে থাকে।
দিল্লির বৈঠক ও নতুন মোড় : ঘটনার মোড় ঘুরে যায় ২২ মে দিল্লির পশ্চিমবঙ্গ ভবনের ওই বৈঠকের পর। ঋতব্রত ব্যানার্জীর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল সংক্ষিপ্ত ও সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক একটি সাক্ষাৎ। সেখানে প্রশাসনিক কিছু বিষয় ও আবাসন সংক্রান্ত আলোচনা হয় এবং মুখ্যমন্ত্রী তার খোঁজখবর নেন বলে তিনি জানান। প্রাথমিকভাবে এটিকে সাধারণ একটি সাক্ষাৎ হিসেবে দেখা হলেও, পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে এটি ঘিরে নানা গুঞ্জন শুরু হয়।
নির্বাচনের পর থেকেই অস্বস্তি : গত ৪ মে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে অস্থিরতার লক্ষণ দেখা দেয়। বিভিন্ন দলীয় বৈঠকে নেতাদের উপস্থিতি কমে যায় এবং নেতৃত্ব, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ পেতে থাকে। একই সঙ্গে দলীয় ক্ষমতার ভারসাম্য এবং অভিষেক ব্যানার্জীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
বিদ্রোহ ও নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি : এর কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ঋতব্রত ব্যানার্জীকে কেন্দ্র করে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী গড়ে ওঠে বলে দাবি করা হয়। পরে দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে প্রায় ৬০ জন তার পক্ষ নিয়ে অবস্থান নেন এবং বিধানসভার স্পিকারের কাছে স্বাক্ষর জমা দেন।
পরবর্তীতে স্পিকার ওই গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেন এবং বিরোধী আসনে বসার অনুমতি দেন। পরে সেই গোষ্ঠী ঋতব্রত ব্যানার্জীকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। এর ফলে বিধানসভায় তৃণমূলের নেতৃত্ব কাঠামোয় বড় পরিবর্তন ঘটে।
মমতা ব্যানার্জীর পদক্ষেপ : ঘটনার পরপরই দলীয় পরিস্থিতি সামাল দিতে তৃণমূল সুপ্রিমো ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী জরুরি পদক্ষেপ নেন। তিনি রাজ্যজুড়ে দলের সব সাংগঠনিক ও সহযোগী কমিটি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে দলীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তৃণমূলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় : ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে মমতা ব্যানার্জী তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন। এরপর দীর্ঘ ২৮ বছরের রাজনৈতিক যাত্রায় দলটি বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করলেও প্রকাশ্য অভ্যন্তরীণ বিভক্তির এমন ঘটনা এই প্রথম।
সাম্প্রতিক এই ঘটনাপ্রবাহ তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
ভোরের আকাশ/সু.পা