মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেয়ার সম্ভাবনা ‘খোলা রাখছে’ বাংলাদেশ, চাপে ভারত!

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেয়ার বিষয়ে ‘ইতিবাচক’ অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সম্প্রতি জানিয়েছেন, জাতীয় স্বার্থ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা বিবেচনায় এ ধরনের প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যোগ দেয়ার ‘সম্ভাবনা খোলা রাখা হচ্ছে’। তবে বাংলাদেশ এমন কোনো পদক্ষেপ নিলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে, বাংলাদেশের এমন আগ্রহ ভারতের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। যদিও এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহ দেশটি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
মক্কা চুক্তি কী
চলতি বছরের ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় এই ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মূল শর্ত হলো তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে বাকি দুটি দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। ন্যাটো সনদের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে এর মিল থাকায় একে অনেকে ইসলামি ন্যাটো বলে অভিহিত করেছেন।
এছাড়া যৌথ সামরিক মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ উৎপাদন এসবও চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইশহাক দার এ চুক্তিকে সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক বলে বর্ণনা করেছেন এবং জানিয়েছেন, এটি অন্যান্য দেশের জন্যও উন্মুক্ত। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, তিনি চান এ চুক্তি একটি ইসলামি ন্যাটোর রূপ নিক এবং কোনো একচেটিয়া ক্লাব হিসেবে না থাকুক।
বাংলাদেশ কেন আগ্রহী?
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বিএসএস) দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট নীতি’ অনুসরণ করছে। জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্রে রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে কোনো অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোতে যোগ দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখছে নিজেদের স্বার্থ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের পরিবর্তিত গতিধারা বিবেচনায় নিয়ে।’ প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ একজন সহযোগীও বিএসএসকে জানিয়েছেন, মক্কা চুক্তির মতো কাঠামোতে যোগ দিতে বাংলাদেশ আগ্রহী।
বাংলাদেশের এমন আগ্রহের পেছনে যেসব কারণ
প্রথমত, রেমিট্যান্স। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে এসেছে প্রায় ৫২৮ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স, যা মোট প্রবাহের প্রায় ১৬ শতাংশ। সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এ খাত সুরক্ষিত রাখতে সহায়ক হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সামরিক সরঞ্জাম। তুরস্ক ও পাকিস্তান ইতোমধ্যে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরবরাহকারী। তুরস্ক ড্রোন, ফ্রিগেট ও সাঁজোয়া যান সরবরাহ করে, আর পাকিস্তান থেকে আসে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান ও নৌযান। চুক্তিতে যোগ দিলে প্রযুক্তি হস্তান্তর, যৌথ উৎপাদন ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়তে পারে।
তৃতীয়ত, জ্বালানি নিরাপত্তা। বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিতে ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। পশ্চিম এশিয়া থেকে তেল ও এলএনজি চালান লোহিত সাগর ও বাব-এল-মান্দেব প্রণালি হয়ে আসে। এ চুক্তি সমুদ্রপথ সুরক্ষা ও জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে ইউরোপমুখী তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য ব্যবহৃত নৌপথের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থত, বিনিয়োগ। সৌদি বিনিয়োগের সম্ভাবনাও বাংলাদেশের জন্য আকর্ষণীয়।
ভারত যেভাবে দেখছে
বাংলাদেশের এমন আগ্রহ ভারতের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ বিষয়ে বলেছেন, পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহ আমরা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।
ভারত সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখলেও পাকিস্তানকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান অতীতে বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ভারতে সন্ত্রাসবাদ ছড়ানোর চেষ্টা করেছে—এ ধারণা নয়াদিল্লিতে এখনো প্রবল। তাই পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের যেকোনো সামরিক সম্পর্ক ভারত সন্দেহের চোখে দেখবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু, সীমান্ত ও পানিবণ্টন নিয়ে দ্বিমত এসব কারণে সম্পর্কে চাপ তৈরি হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘জাতীয় স্বার্থকে পাশ কাটিয়ে তাড়াহুড়ো করে শীর্ষ পর্যায়ের সফর বিনিময়ের কোনো যৌক্তিকতা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশকে বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বাস্তবতা যথাযথভাবে বুঝতে হবে, যে অভ্যুত্থানে দেড় হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ দিয়েছেন।’
হুমায়ুন কবির ভারতের কড়া সমালোচনা করে বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনের পতনের পর অপরাধী হিসেবে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনাকে ভারতে রাজনৈতিক বা গণমাধ্যমের জায়গা দেয়া ভারতের গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের পরিপন্থি।’ তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোটি কোটি বাংলাদেশিকে ক্ষুব্ধ করেছে।’
আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনাও ক্ষীণ বলে জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, নির্দিষ্ট বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে ঐকমত্য এবং মর্যাদাপূর্ণ আমন্ত্রণ ছাড়া এ সফর হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়নি।
চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন মাত্রা
হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ‘টু প্লাস টু’ মেকানিজম ও ব্যাপক অংশীদারত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বেইজিংয়ের সঙ্গে আরও গভীর সম্পৃক্ততা চাওয়া হচ্ছে, তবে ভূ-রাজনৈতিক চাপ এড়িয়েই।’
পাকিস্তানের সঙ্গেও বাণিজ্য ও জনগণের মধ্যে সংযোগ বাড়ানোর বিষয়ে কাজ হচ্ছে বলে তিনি জানান এবং একে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা হিসেবে বর্ণনা করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সৌদি যুবরাজের আমন্ত্রণে রিয়াদ সফর গ্রীষ্মের পর চূড়ান্ত হতে পারে বলেও জানান তিনি।
চ্যালেঞ্জ কোথায়?
মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পাকিস্তান যে চুক্তির অন্যতম প্রবক্তা, সেই পাকিস্তানের সঙ্গে যেকোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে দেশের অভ্যন্তরে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলোর কাছ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সমাজের একটি বড় অংশের কাছে এখনো জীবন্ত।
ভারত ও চীন এই দুই প্রতিবেশী বড় শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যপদ্ধতি ও সদস্যপদের শর্তও এখনো পরিষ্কার নয়। তবে বাংলাদেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয়ার চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়নি। পরিবর্তিত আঞ্চলিক সামরিক ও অর্থনৈতিক মেরুকরণে ঢাকা কীভাবে নিজের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তার ভারসাম্য রক্ষা করে সেদিকেই নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল।
ভোরের আকাশ/এনএস