ট্রাম্পের জ্বালানি যুদ্ধবিরতি থেকে সরে এসে রুশ তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের যুদ্ধবিরতি থেকে সরে এসে রাশিয়ার একটি তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়া যুদ্ধবিরতি না মানায় রুশ শোধনাগারে হামলা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত আর কার্যকর নেই। আজ (বৃহস্পতিবার ১৫ অক্টোবর) রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
জেলেনস্কি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, রুশ তেল শোধনাগারে হামলার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে। তার ভাষায়, ‘আমরা আর এই বাধা মানছি না।’
গত রোববার ট্রাম্প আকস্মিকভাবে ঘোষণা দেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধে সম্মত হয়েছে। এরপর ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা স্থগিত রাখে। ট্রাম্পের দাবি, এসব হামলার কারণে বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম বাড়ছে।
কিন্তু পরবর্তী দিনগুলোতে রাশিয়া ইউক্রেনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রাখে। বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলায় কয়েক লাখ মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এর পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার বিষয়ে ইউক্রেনের ধৈর্য শেষ হয়ে গেছে বলে জানান জেলেনস্কি।
বৃহস্পতিবার রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর দক্ষিণ-পূর্বে রিয়াজান অঞ্চলের একটি তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় আগুন লাগে। রাশিয়ার সরকারি তেল কোম্পানি রসনেফটের মালিকানাধীন শোধনাগারটি দেশটির মোট শোধনক্ষমতার প্রায় ৫ শতাংশের সমান। মস্কোতে জ্বালানি সরবরাহেও এটি ভূমিকা রাখে।
রিয়াজান অঞ্চলের গভর্নর পাভেল মালকভ টেলিগ্রামে জানান, ইউক্রেনের বড় ধরনের ড্রোন হামলায় শোধনাগারটিতে আগুন ধরে যায়। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে এবং জরুরি সেবার কর্মীরা ঘটনাস্থলে রয়েছেন। ইউক্রেনের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তার ভাষ্য অনুসারে, রাশিয়ার সাম্প্রতিক ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জবাবে এ হামলা চালানো হয়েছে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ার আশঙ্কা
রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ রাখার বিষয়ে ট্রাম্পের দাবি থেকে সরে আসায় কিয়েভ ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কে আরও টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার অভিযান শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে এটিকে সবচেয়ে বড় মতবিরোধের একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্প সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইউক্রেনের ওপর চাপ বাড়িয়েছেন। গত সপ্তাহে রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পর তিনি ইউক্রেনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের আহ্বানও জানান। অন্যদিকে, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা বন্ধ হওয়া উচিত বলে বারবার মন্তব্য করেছেন তিনি।
ইউক্রেনের উদ্বেগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ বাড়লে যুদ্ধক্ষেত্রে দেশটির সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা এবং ড্রোন পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মার্কিন প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভরশীল ইউক্রেন।
গত কয়েক দিনে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে তারা নিয়মিত আগাম সতর্কবার্তা পাচ্ছেন না। এসব সতর্কবার্তার জন্য মার্কিন স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করা হয়। তবে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ট্রাম্প। জেলেনস্কি বলেছেন, সতর্কবার্তা না পাওয়ার বিষয়টিকে তাদের কাছে প্রযুক্তিগত ত্রুটি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এদিকে, দ্রুতগতিতে চলা যানবাহনে স্থাপন করা হলে সামরিক কাজে ব্যবহৃত স্টারলিংক টার্মিনালের কার্যকারিতাও কমে গেছে। ফলে ইউক্রেনের ড্রোন পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, চলন্ত অবস্থায় টার্মিনালগুলো আবার কাজ করছে, তবে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৬০ কিলোমিটার গতিতে। মাঝারি পাল্লার হামলাকারী ড্রোন ও রুশ ড্রোন ঠেকাতে ব্যবহৃত প্রতিরোধী ড্রোনের জন্য এই গতি যথেষ্ট নয় বলে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক বলেছেন, স্টারশিল্ড নামে পরিচিত সামরিক সংস্করণের স্টারলিংক ব্যবস্থার ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন। এর গতি বা ব্যবহারে কোনো সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হবে কি না, তা মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্ধারণ করেন।
রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনে হতাহত
বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের মধ্যাঞ্চলীয় কিরোভোহরাদ অঞ্চলে রাশিয়ার রাতভর হামলায় তিনজন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন। ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের দাবি, রাশিয়া পাঁচ শতাধিক ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি নাফতোগাজ জানিয়েছে, পোলতাভা অঞ্চলে তাদের একটি গ্যাস উত্তোলনকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে সেখানে কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের নৌবাহিনী দাবি করেছে, রাশিয়ার ভোরোনেজ অঞ্চলের বোরিসোগলেবস্ক বিমানঘাঁটিতে রাতভর হামলা চালিয়ে ছয়টি এসইউ-৩৪এম সামরিক বিমান ধ্বংস করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা জানায়, হামলায় নেপচুন উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে।
ক্রেমলিন বৃহস্পতিবার বলেছে, রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলা যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রচেষ্টার পরিপন্থী। এর আগে মস্কো জানিয়েছিল, জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের যুদ্ধবিরতির আওতা এখনো নির্ধারিত হয়নি এবং এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে শর্ত জেলেনস্কির
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি মস্কোর সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি করতে ওয়াশিংটনের আগ্রহ এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি ট্রাম্পের ইতিবাচক মনোভাবের সমালোচনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের জন্য রুশ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ রাখতে রাজি কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে জেলেনস্কি বলেছেন, বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার আরও ইন্টারসেপ্টর পেলে তিনি এ বিষয়ে সম্মত হতে পারেন। তাঁর ভাষায়, এটিই হবে গ্রহণযোগ্য ন্যূনতম শর্ত।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। ইউরোপের কাছে স্টারলিংকের বিকল্প কিংবা রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত করার মতো মার্কিন স্যাটেলাইট ব্যবস্থার সমতুল্য প্রযুক্তি এখনো নেই।
ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করলেও ইউরোপীয় মিত্রদের মাধ্যমে দেশটিকে মার্কিন অস্ত্র কেনার সুযোগ দিয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিরোধ আরও বাড়লে ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতার ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ভোরের আকাশ/এনএস