ইলন মাস্কের স্টারলিংক ‘ফাঁদে’ জেলেনস্কি, ড্রোন হারাচ্ছে ইউক্রেন

স্যাটেলাইভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবা স্টারলিংককে রীতিমতো ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করছেন স্পেসএক্সের মালিক ও প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক। আর এই পাতানো ফাঁদে পা দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে চলমান সংঘাতে আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার উভয় ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে হঠাৎ স্টারলিংকের ইন্টারনেট সেবার গতি কমে যাওয়ায় ইউক্রেনের আত্মঘাতী ড্রোন পরিচালনা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়ে পড়েছে।
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার পর সংঘাতে সরাসরি যুক্ত হয় ইউক্রেন। সংঘাত দীর্ঘায়িত হতে পারে এই শঙ্কা থেকে নিজেদের ড্রোন প্রযুক্তি অত্যাধুনিক করেছে কিয়েভ। সেই থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি সৈন্য পাঠিয়ে হতাহতের চেয়ে ড্রোন মোতায়েন করে কৌশলী অবস্থান নেন জেলেনস্কি। ড্রোন প্রযুক্তির ব্যাপক কারিগরি উন্নতি ঘটানোয় চাপে পড়ে রাশিয়া।
যুদ্ধক্ষেত্রে সফলতা অর্জন ও শত্রুপক্ষকে প্রতিহত করতে মোতায়েন করা ড্রোন পরিচালনায় উচ্চগতির ইন্টারনেটের প্রয়োজন হলে ইলন মাস্কের স্টারলিংক সংযোগ প্রতিস্থাপন করেন জেলেনস্কি। কিন্তু মাস্কের প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি হঠাৎ উচ্চগতির স্টারলিংকের ইন্টারনেট পরিষেবার গতিসীমা নির্ধারণ করায় ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে বেকায়দায় পড়েছে। এমনকি হঠাৎ হঠাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় ড্রোনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন চালকেরা।
দক্ষিণ ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া শহরকে রক্ষার জন্য সপ্তম দ্রুত প্রতিক্রিয়া বাহিনী কয়েক মাস ধরে রাশিয়ার সরবরাহ লাইনে নিরলস হামলা চালিয়ে আসছে। শহরটি এখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মাত্র প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। গত ১২ অক্টোবর রাত পর্যন্ত এই বাহিনী স্টারশিল্ডের ওপর নির্ভর করছিল। স্টারলিংক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের সামরিক সংস্করণ হলো স্টারশিল্ড। এটি ড্রোনচালকদের দ্রুতগতির ড্রোনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে সহায়তা করে।
তবে ১৩ অক্টোবর কোনো এক সময় হঠাৎ সেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সপ্তম আর্মি কোরের এক মুখপাত্রের মতে, ইউক্রেনের ড্রোনচালকেরা দ্রুতগতির চালকবিহীন আকাশযানের (ইউএভি) সঙ্গে যোগাযোগে ১০ থেকে ২০ সেকেন্ড স্থায়ী বিঘ্ন লক্ষ করেন। এই পরিবর্তনগুলো ‘উড্ডয়নরত স্টারলিংক-নির্দেশিত ড্রোনগুলোর ব্যবহারকে সরাসরি প্রভাবিত করে’। এর ফলে কিছু অভিযান বাতিল করতে হয়েছিল।
স্থানীয় সময় ১৪ অক্টোবর (বুধবার) সকাল নাগাদ সমস্যাটির সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সেরহি ‘ফ্ল্যাশ’ বেসক্রেস্টনভের মতে, ধারণা করা হচ্ছে, স্পেসএক্স ইউক্রেনের ড্রোনগুলোর ওপর ঘণ্টায় ১৬১ কিলোমিটারের একটি কার্যত ‘গতিসীমা’ আরোপ করেছে। ঘণ্টায় মাত্র প্রায় ৬৪ কিলোমিটার গতিতে উড়ন্ত চালকবিহীন আকাশযানের ক্ষেত্রেও যোগাযোগে বিঘ্ন দেখা গেছে।
এর ফলে ইউক্রেনের ড্রোনভান্ডারের একটি বড় অংশ কার্যত অকেজো হয়ে পড়েছে। এসব ড্রোন এখন রাশিয়ার পাল্টা ব্যবস্থার সহজ লক্ষ্যে পরিণত হতে পারে।
শুধু পেন্টাগন-নিয়ন্ত্রিত স্টারশিল্ড কর্মসূচির আওতায় এই গতির চেয়ে বেশি গতিতে উড্ডয়নের অনুমতি দেওয়া হয়। এ কারণে জল্পনা তৈরি হয়েছে, সিদ্ধান্তটি স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কের পরিবর্তে মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
তবে মার্কিন সরকারের একজন কর্মকর্তা এ দাবি অস্বীকার করেছেন।
এ ছাড়াও সব ধরনের ড্রোন এই সমস্যায় পড়েনি। ফার্স্ট-পার্সন ভিউ (এফপিভি) ড্রোন রেডিও সংকেতের ওপর নির্ভর করে। তাই কিয়েভ এখনো রুশ বাহিনীকে লক্ষ্য করে প্রতিদিন হাজার হাজার ড্রোন উৎক্ষেপণ করতে পারে। কিছু দূরপাল্লার গোয়েন্দা ড্রোন স্টারলিংক ব্যবহার করে। তবে এক ইউক্রেনীয় ড্রোনপ্রযুক্তি নির্মাতা টেলিগ্রাফকে বলেছেন, এসব ড্রোনের বেশির ভাগই ‘বিকল্প’ ব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারে।
রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে হামলা বন্ধ করতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির অস্বীকৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করার পর এ ঘটনা ঘটল। ট্রাম্পের যুক্তি, এসব হামলার কারণে ডিজেলের দাম বাড়ছে। পর্যবেক্ষকেরা আগেই পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের ওপর চাপ বাড়াতে পারে। তবে স্টারলিংকের এই ঘটনার সঙ্গে ওই পরিস্থিতির কোনো সম্পর্ক রয়েছে, এমন ইঙ্গিত দেওয়ার মতো প্রমাণ নেই।
জেরান চালকবিহীন আকাশযান ঘণ্টায় প্রায় ৪৮৩ কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারে। স্টারলিংকের গতিসীমার কারণে সৃষ্ট বিঘ্নের মধ্যে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলো এসব ড্রোন মোকাবিলায় সমস্যায় পড়তে পারে।
ইউক্রেন এখনও ড্রোন ব্যবহার করে স্বল্পপাল্লার হামলা চালাতে পারে। কারণ, উৎক্ষেপণের আগেই এসব ড্রোনের গতিপথ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। তবে শত্রুপক্ষের ভূখণ্ডের ৪০২ কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধের সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। এতে মস্কো পূর্বাঞ্চলীয় ভূখণ্ডে নিজেদের বাহিনীকে রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের ড্রোন নিয়ে তুলনামূলক কম উদ্বেগে থাকতে পারবে।
সম্মুখসমরের ক্ষেত্রে নিম্ন-পৃথিবী কক্ষপথের উপগ্রহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ কক্ষপথের উপগ্রহের তুলনায় এগুলো দ্রুত সাড়া দিতে পারে। এ ছাড়া এগুলো ব্যবহারের জন্য সেনাদের বড় আকারের গ্রাহক অ্যান্টেনা বহন করতে হয় না।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও সামরিক তথ্যবিশেষজ্ঞ টমাস উইথিংটন বলেন, ‘স্টারলিংকের অন্যতম প্রধান সুবিধা হলো, এই ব্যবস্থা দিয়ে ভিডিও ও ছবি থেকে শুরু করে বিস্তারিত যুদ্ধ প্রতিবেদন পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ তথ্য পাঠানো যায়।’
ভোরের আকাশ/এনএস