ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলের যুদ্ধ ‘ফ্রোজেন কনফ্লিক্টের’ দিকে যাচ্ছে

যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি শুরুই হয়েছিল মীমাংসা করার উদ্দেশে। সেই অস্ত্রবিরতির মেয়াদ শেষ হতে কয়েক ঘণ্টা বাকি। কিন্তু এখনো যুদ্ধের মূলে থাকা সমস্যাগুলো সমাধানে খুব একটা অগ্রগতি দেখা যায়নি। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে যুদ্ধ আসলে কোন দিকে যাচ্ছে?
যুদ্ধের সবচেয়ে সম্ভাব্য যে পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে সেটি হলো- ‘ফ্রোজেন কনফ্লিক্ট’। এটি বেশ জটিল এক পরিস্থিতি। যেখানে সংঘাত একেবারে থেমেও যায় না, আবার পুরোদমেও চলে না। সংঘাতের মাত্রা বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে বাড়ে বা কমে।
সাধারণত দেশগুলো কোনো রাজনৈতিক চুক্তি করতে ব্যর্থ হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ২০১৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত (পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর আগে) পরিস্থিতিকে ফ্রোজেন কনফ্লিক্টের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ওই সময়ে প্রায় ১৪ হাজার সামরিক ও বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারান। একইসঙ্গে সাইবার ও তথ্যযুদ্ধ চলে।
এখন পাকিস্তানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় দফার আলোচনা শুরুর পর শেষ পর্যন্ত যদি কোনো সমঝোতা হয়, তবু সেটি ব্যাপক পরিসরের শান্তি চুক্তির দিকে গড়াবে না। বরং একটি ফ্রোজেন কনফ্লিক্টের দিকে এগোবে। এর পেছনে তিনটি কারণ আছে।
প্রথম কারণ: ট্রাম্পের নীতি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি যুদ্ধবিরতিকে সংঘাতের সমাপ্তি বলে মনে করেন। অর্থ্যাৎ, মূল সমস্যার সমাধান করার চেয়ে বিরতি দেওয়াকে তিনি অগ্রাধিকার দেন। এরপর তাঁর মনোযোগ অন্যদিকে সরে যায়। ফলে পরবর্তীতে মূল সমস্যাগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে।
ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি ১০টি যুদ্ধ বন্ধ করেছেন। এর মধ্যে লেবাননের সঙ্গে ইসরায়েলের বর্তমান সংঘাতও অন্তর্ভুক্ত। তবে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এই সংঘাতগুলোর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। মূল সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান হয়নি।
গত বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের সংঘাতকে আরেকটি ফ্রোজেন কনফ্লিক্টের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ট্রাম্প ঘোষণা দিয়ে ওই যুদ্ধ থামালেও দেশ দুটির মধ্যে এখনো নতুন করে সংঘাত শুরুর ঝুঁকি আছে। এছাড়া, সীমান্ত নিয়ে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সংঘাতেও ট্রাম্প মধ্যস্থতা করেন। কিন্তু মূল সমস্যা নিরসন না করায় দেশ দুটি পরে বিচ্ছিন্নভাবে সংঘাতে জড়িয়েছে।
দ্বিতীয় কারণ: অসম যুদ্ধের সমাধান কঠিন
সামরিক শক্তির ব্যবধান বিবেচনায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধটি অসম। ফলে লড়াইয়ে টিকে থাকতে ইরান বেশকিছু কৌশল অবলম্বন করেছে। এর মধ্যে আছে, উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন অবকাঠামোতে হামলা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া।
গবেষণায় দেখা গেছে, অসম যুদ্ধগুলো বেশিরভাগ সময়ই দীর্ঘস্থায়ী এবং অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে থাকে। একটা সময় পর সেটি ফ্রোজেন কনফ্লিক্টে রূপ নেয়। কারণ, দুর্বল দেশ কখনোই শক্তিশালী পক্ষের বিরুদ্ধে প্রথাগত সামরিক যুদ্ধে জয়ী হতে পারে না। তাই তারা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগ করে শক্তিশালী দেশটিকে পরিশ্রান্ত এবং যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করার চেষ্টা করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এটিই দেখা যাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রমবর্ধমান চাপ অনুভব করছেন এবং একটি যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটছেন। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিজয় দাবি করছেন। অন্যদিকে, ইরান স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার থেকে নয় বরং টিকে থাকার অংশ হিসেবে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে।
এটি আফগানিস্তানের তালেবানদের কথা মনে করিয়ে দেয়। তালেবানরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ২০ বছর ধরে চলা একটি ফ্রোজেন কনফ্লিক্টে টিকে ছিল। শেষ পর্যন্ত মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর পুনরায় দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
তৃতীয় কারণ: জটিল বিষয়ে গুরুত্ব নেই
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে বিষয় নিয়ে উত্তেজনা চলছে সেটি- পারমাণবিক কর্মসূচি। কিন্তু এ সমস্যার সমাধানে কোনো পক্ষকেই প্রতিশ্রুতিবন্ধ বলে মনে হচ্ছে না। ওয়াশিংটনের ভাষ্য, তেহরান পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে আপস করতে রাজি না হওয়ায় ইসলামাবাদে প্রথম দফার সংলাপ ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের যুক্তি হলো- বেসামরিক প্রয়োজনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করাটা তাদের অধিকার।
প্রায় ২০ মাস ধরে প্রচেষ্টা চালানোর পর ২০১৫ সালে দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু তিন বছর পর চুক্তিটি ‘একপাক্ষিক’ অ্যাখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন ট্রাম্প। এই ইতিহাস বিবেচনায় নিলে দুই দেশের মধ্যকার জটিল বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, কারিগরি দিকগুলো ভবিষ্যতে সমাধানের পথ খোলা রেখে ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি আংশিক চুক্তির ঘোষণা দিতে পারে। কিন্তু তারপরও সমস্যা সমাধানের আশা করা যায় না। কারণ, পারমাণবিক অধিকারের বিষয়ে ইরানের নমনীয় হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ ও বিশ্ব অর্থনীতিতে বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা এরইমধ্যে নিজেদের দৃঢ় অবস্থান জানান দিচ্ছে।
ফ্রোজেন কনফ্লিক্টের প্রভাব
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উভয়পক্ষের কাছে থেকে পাল্টাপাল্টি হুমকি আসবে। এর ফলে ইসরায়েল-ইরান কিংবা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অথবা তিন পক্ষই সময়ে সময়ে সহিংসতায় জাড়তে পারে। এটি অনেকটা গাজার বর্তমান পরিস্থিতির মতো।
গত বছরের অক্টোবরে ট্রাম্পের ২০ দফার শান্তি পরিকল্পনার অধীনে ইসরায়েল এবং হামাস একটি যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। এরপর পরিকল্পনার প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে জিম্মি ও বন্দি বিনিময় হয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ কমে যাওয়ার পর ত্রাণ সরবরাহ শুরু হয়।
কিন্তু গাজার শাসনব্যবস্থা, উপত্যকা পুনর্গঠন এবং হামাস যোদ্ধাদের নিরস্ত্রীকরণের মতো জটিল বিষয়ের এখনো সমাধান হয়নি। ফলে ইসরায়েল তাদের সৈন্য পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। থেমে থেমে সহিংসতাও অব্যাহত আছে।
ভোরের আকাশ/নি