রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে এবার আরও সক্রিয় ভারত

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের মধ্যস্থতায় ভারত এখন কেবল মৌখিক আহ্বানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও সরাসরি ও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর নয়াদিল্লিতে এক নিরাপত্তা সম্মেলনে (মিউনিখ লিডার্স মিটিং) আনুষ্ঠানিকভাবে এই উদ্যোগের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, গত কয়েক মাস ধরে ভারত শুধু যুদ্ধ থামানোর দাবি জানানোর গণ্ডি পেরিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় দেশের সঙ্গেই সরাসরি সংঘাত নিরসনের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
জয়শঙ্করের এই বক্তব্য এমন সময়ে এল, যখন কৃষ্ণ সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও জানিয়েছেন, কৃষ্ণ সাগরে নিরাপদ বাণিজ্যিক নৌচলাচল ফেরাতে ভারত, তুরস্ক ও মিসরের দেওয়া বিভিন্ন প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।
জয়শঙ্কর বলেন, যুদ্ধের অবসানে সংলাপ ও কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই।
রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে আরও বিস্তৃত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
দুই দেশের সহযোগিতা এখন শুধু প্রতিরক্ষা বা কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। জ্বালানি, মহাকাশ, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ক রয়েছে।
ভারত শুরু থেকেই যুদ্ধ বন্ধে সংলাপ ও কূটনীতির ওপর জোর দিয়ে আসছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সরাসরি সমালোচনা থেকেও নয়াদিল্লি বিরত থেকেছে। জাতিসংঘে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন ভোটাভুটিতেও ভারত একাধিকবার ভোটদানে বিরত থেকেছে।
গত আগস্টের শেষ দিকে কিরগিজস্তানে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানে যুদ্ধের অবসান ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি।
এরপর সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকেও পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন মোদি। দুই নেতা ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক আরও গভীর করার অঙ্গীকার করেন।
রুশ তেল নিয়ে চাপের মধ্যেও সম্পর্ক অটুট
ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি জ্বালানি। রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে ভারত। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই নয়াদিল্লিকে রাশিয়ার তেল কেনা কমানো বা বন্ধ করার জন্য চাপ দিয়ে আসছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সময় ভারতের রুশ তেল আমদানি কিছুটা কমলেও পরে তা আবার বাড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও রাশিয়া-ভারত তেল বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি আবার বেড়েছে এবং দেশটি এশিয়ার জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
প্রতিরক্ষাতেও রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা
প্রতিরক্ষা খাতেও রাশিয়া ভারতের অন্যতম প্রধান অংশীদার। ভারতীয় সামরিক বাহিনীর অস্ত্রভাণ্ডারে রুশ নির্মিত বিপুলসংখ্যক যুদ্ধবিমান, সামরিক সরঞ্জাম এবং একাধিক এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে।
২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে চার দিনের সামরিক সংঘাতের সময় ভারতীয় বাহিনী এস-৪০০ ব্যবস্থার কয়েকটি ব্যবহার করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা নয়াদিল্লির জন্য সহজ নয়।
এমন বাস্তবতায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগে ভারতের সক্রিয়তা শুধু শান্তি প্রতিষ্ঠার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নয়, বরং কৃষ্ণ সাগরের নৌপথ, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে উঠছে।
ভোরের আকাশ/আ.র