ক্যালিফোর্নিয়া মেয়র আইলিন ওয়াংয়ের চীনের হয়ে ‘গুপ্তচরবৃত্তির’ কথা স্বীকার

চীনের হয়ে গোপনে কাজ করার অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের আর্কাডিয়া শহরের মেয়র আইলিন ওয়াং। মার্কিন বিচার বিভাগের অভিযোগ, তিনি চীনা সরকারের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রে বেইজিংপন্থি প্রচারণা চালিয়েছেন এবং এ তথ্য মার্কিন সরকারের কাছে গোপন রেখেছেন।
স্থানীয় সময় সোমবার (১১ মে) যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানায়, ৫৮ বছর বয়সী ওয়াংয়ের বিরুদ্ধে ‘বিদেশি সরকারের অবৈধ এজেন্ট হিসেবে কাজ করার’ অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালতের নথি অনুযায়ী, তিনি এই ফৌজদারি অভিযোগে দোষ স্বীকার করতে সম্মত হয়েছেন। অপরাধ প্রমাণিত হলে তার সর্বোচ্চ ১০ বছরের ফেডারেল কারাদণ্ড হতে পারে।
ওই দিনই লস অ্যাঞ্জেলেসের কেন্দ্রীয় এলাকার মার্কিন জেলা আদালতে তার প্রথম হাজিরা হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে দোষ স্বীকার করবেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে। আইলিন ওয়াং ২০২২ সালের নভেম্বরে আর্কাডিয়া সিটি কাউন্সিলে নির্বাচিত হন। পাঁচ সদস্যের এই কাউন্সিল থেকেই পর্যায়ক্রমে মেয়র নির্বাচন করা হয়।
মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল জন এ. আইজেনবার্গ বলেন, চীনা সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করা একজন ব্যক্তি বর্তমানে জনআস্থার পদে রয়েছেন— এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, বিদেশি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গোপন রেখে কোনো জনপ্রতিনিধির কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের জন্য হুমকি।
ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্টের ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ইউএস অ্যাটর্নি বিল এসাইলি বলেন, যারা গোপনে বিদেশি শক্তির হয়ে কাজ করে, তারা দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দেয়। ওয়াংয়ের স্বীকারোক্তিকে তিনি চীনের প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
এফবিআইয়ের কাউন্টারইন্টেলিজেন্স ও গুপ্তচরবৃত্তি বিভাগের সহকারী পরিচালক রোমান রোঝাভস্কি বলেন, ওয়াংয়ের এই স্বীকারোক্তি একটি স্পষ্ট বার্তা— বিদেশি সরকারের হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের শেষ দিক থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ওয়াং এবং ক্যালিফোর্নিয়ার চিনো হিলস এলাকার বাসিন্দা ইয়াওনিং মাইক সান চীনা সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে সমন্বয় করে চীনের স্বার্থে প্রচারণা চালান। মাইক সান গত বছরের অক্টোবরে একই অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন এবং বর্তমানে চার বছরের ফেডারেল কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
তদন্তে জানা গেছে, ওয়াং ও সান যৌথভাবে ‘ইউএস নিউজ সেন্টার’ নামে একটি ওয়েবসাইট পরিচালনা করতেন। এটি স্থানীয় চীনা-আমেরিকান কমিউনিটির সংবাদমাধ্যম হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, চীনা সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দেশে সেখানে নিয়মিত বেইজিংপন্থি কনটেন্ট প্রকাশ করা হতো।
আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২১ সালের জুনে এক চীনা কর্মকর্তা উইচ্যাটের মাধ্যমে আগে থেকে প্রস্তুত করা কিছু নিবন্ধ ওয়াং ও তার সহযোগীদের পাঠান। এসব নিবন্ধে দাবি করা হয়েছিল, শিনজিয়াংয়ে কোনো গণহত্যা বা জোরপূর্বক শ্রমের ঘটনা ঘটেনি।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওয়াং ওই নিবন্ধ নিজের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেন এবং লিংকটি চীনা কর্মকর্তাকে পাঠান। পরে ওই কর্মকর্তা দ্রুত কাজ সম্পন্ন করায় তাদের ধন্যবাদ জানান। একই বছরের আগস্টে আরও একটি নিবন্ধ প্রকাশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমন্বয়ের প্রমাণ পেয়েছে তদন্তকারীরা। এমনকি চীনা কর্মকর্তার অনুরোধে ওয়াং নিবন্ধে পরিবর্তনও করেছিলেন বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
২০২১ সালের নভেম্বরে ওয়াং জন চেন নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যাকে আদালতের নথিতে চীনের গোয়েন্দা কাঠামোর উচ্চপর্যায়ের সদস্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। জন চেন পরবর্তীতে চীনের অবৈধ এজেন্ট হিসেবে কাজ করা ও ঘুষ ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষ স্বীকার করে ২০ মাসের কারাদণ্ড পান।
ওয়াং তার স্বীকারোক্তিতে বলেন, তিনি কখনও যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেলকে জানাননি যে তিনি চীনের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছিলেন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, তার পরিচালিত ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কিছু কনটেন্ট যে চীনা সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দেশে প্রকাশ করা হয়েছে, সেটিও গোপন রাখা হয়েছিল।
এদিকে পৃথক এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, আইলিন ওয়াং ইতোমধ্যে আর্কাডিয়ার মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। শহরের ব্যবস্থাপক ডমিনিক লাজারেত্তো বলেন, অভিযোগে যেসব কর্মকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো ওয়াং মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ঘটেছিল। তিনি আরও জানান, শহরের কোনো অর্থ বা কর্মী এ ঘটনায় জড়িত ছিল না।
লস অ্যাঞ্জেলেস শহর থেকে প্রায় ২১ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত আর্কাডিয়া শহরে প্রায় ৫৩ হাজার মানুষের বসবাস। শহরটিতে এশীয় বংশোদ্ভূত ও চীনা বংশোদ্ভূত বাসিন্দাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। সূত্র: অফিস অব পাবলিক অ্যাফেয়ার্স, ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস
ভোরের আকাশ/সু.পা