নির্বাচনের পরই ইরানে হামলা, মিত্রদের সতর্কবার্তা ট্রাম্পের

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোকে সতর্ক করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। মার্কিন কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের বরাতে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সংবেদনশীল কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সতর্কতার বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতি না থাকায় ওই দুই কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে তথ্য দিয়েছেন।
তবে ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানিয়েছেন তারা।
ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ৩ নভেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের পর ইরানে নতুন সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়টি তিনি বিবেচনা করছেন।
মার্কিন কর্মকর্তারা আঞ্চলিক মিত্রদের জানিয়েছেন, নতুন সামরিক অভিযান শুরু হলে তা কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে। তবে ইরান ও দেশটির সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পাল্টা হামলার আশঙ্কায় আঞ্চলিক কর্মকর্তারা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
মিত্রদের বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে, ইরানের প্রতিক্রিয়ায় জ্বালানি স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা হতে পারে। ফলে এসব স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার এবং সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
গত সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ইরানে কোনো হামলা চালায়নি যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো ও বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে।
কূটনীতির সুযোগ এখনো দেখছে তেহরান
নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কার মধ্যেও কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখার কথা জানিয়েছে ইরান। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, তেহরান এখনো কূটনীতিকে সফল হওয়ার সুযোগ দিতে চায়।
গত মাসে ইরানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতিতে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি। যদিও ওই প্রস্তাব ট্রাম্প সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সংযম ও বিচক্ষণতা প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। উত্তেজনা কমাতে এবং পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু হওয়া ঠেকাতে রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগোনোর ওপর জোর দিয়েছে আবুধাবি।
পারস্য উপসাগরে মার্কিন সামরিক শক্তি বৃদ্ধি
ইরানে সম্ভাব্য নতুন অভিযান সামনে রেখে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিও বাড়ানো হয়েছে। গত মাসের শেষ দিকে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরিসহ একাধিক উভচর যুদ্ধজাহাজ এবং মেরিন সেনা মোতায়েন করা হয়। সান দিয়েগো থেকে পাঠানো ওই বহরে প্রায় ৯ হাজার সেনা রয়েছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই মোতায়েনের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ২০ হাজারের বেশি নাবিক ও মেরিন সেনা এবং শত শত যুদ্ধবিমান নিয়ে অস্বাভাবিক শক্তিশালী মার্কিন সামরিক উপস্থিতি তৈরি হতে পারে। গত দুই দশকে এমন ব্যাপক উপস্থিতি মাত্র কয়েকবার দেখা গেছে।
এদিকে বুধবার রাতে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের শীর্ষ সামরিক পরিকল্পনাবিদ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ব্রেট সিলভিয়াকে অপসারণের খবরও সামনে আসে। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের কৌশল, পরিকল্পনা ও নীতি বিভাগের প্রধান পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে তার অপসারণের কারণ জানানো হয়নি এবং তাৎক্ষণিকভাবে কোনো উত্তরসূরিও নিয়োগ করা হয়নি।
নির্বাচনের আগে যুদ্ধের চাপ, ব্যয় ৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল
ইরান যুদ্ধ মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় চাপ তৈরি করেছে। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রচারে যুদ্ধের প্রভাব স্পষ্ট। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
পেন্টাগনের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের জন্য মার্কিন করদাতাদের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে।
রিপাবলিকানদের পক্ষে প্রচারণা চালাতে গিয়ে ট্রাম্প বারবার যুদ্ধ শিগগির শেষ হওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। একই সঙ্গে নির্বাচনের পর নতুন করে বোমা হামলার হুমকিও দিয়েছেন।
মঙ্গলবার টেক্সাসের লুবক শহরে নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সংঘাতের চূড়ান্ত অবসান হতে পারে। তার ভাষায়, যুদ্ধ শেষ হবে যখন তিনি চান; তবে ইরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করেই সংঘাতের সমাপ্তি ঘটাতে হবে।
তবে নির্বাচনের আগেই তেহরান কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ওয়াশিংটনের কট্টরপন্থি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের নির্বাহী পরিচালক জোনাথন শ্যানজার। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আসন্ন মনে হলে ইরান কেন নির্বাচনের পর পর্যন্ত অপেক্ষা করবে, বরং আগেই পদক্ষেপ নিয়ে কৌশলগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
ফলে মার্কিন নির্বাচনের পর ইরানে নতুন সামরিক অভিযান শুরু হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে।
ভোরের আকাশ/আ.র