বৈশ্বিক পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংকের

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ, পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং অন্যান্য ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কার কারণে ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে সামগ্রিক পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত সংস্থাটির সর্বশেষ কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক প্রতিবেদনে জানানো হয়, চলমান সংকট অব্যাহত থাকলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। পাশাপাশি রাশিয়ার তেল অবকাঠামোতে ক্রমাগত ক্ষয়ক্ষতি বিশ্ব অর্থনৈতিক বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলার আশঙ্কা রয়েছে।
বুধবার প্রকাশিত এই অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি, প্রাকৃতিক গ্যাস, খাদ্যপণ্য ও ধাতুর দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও এর পরবর্তী বছরে পণ্যের সার্বিক মূল্য ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে ১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে ভয়াবহ 'এল নিনো' আবহাওয়া পরিস্থিতির পূর্বাভাস এই স্বস্তি বিনষ্ট করতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে খাদ্য পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম বজায় থাকলে তা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণে বাধ্য করবে।
বিশ্বব্যাংকের ডেপুটি চিফ ইকোনমিস্ট আয়হান কোসে বৈশ্বিক বাজারের বিদ্যমান সংকট তুলে ধরে বলেন, আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার একই সাথে একাধিক বড় ধরনের ধাক্কার মুখোমুখি হচ্ছে। জ্বালানির বাড়তি খরচ এবং বাণিজ্য সরবরাহে বাধা বিভিন্ন ধরনের পণ্যের দাম একযোগে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি সরাসরি বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর এটা সর্বোচ্চ স্তর। তেল উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে ব্যারেল প্রতি ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের গড় দাম ৯২ ডলারে উন্নীত হতে পারে। তবে এ বছর বিশ্বজুড়ে তেলের চাহিদা ২.৫ শতাংশ কমে যাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় দাম এর চেয়ে বেশি বাড়েনি। ২০২০ সালের কোভিড মহামারি এবং ১৯৮০ সালের তেল সংকটের পর তেলের চাহিদায় এটিই তৃতীয় বৃহত্তম পতন। এই সংকটকালীন সময়ে বিশ্বজুড়ে তেলের মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে এবং ২০২৬ সালে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ৫.২ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। যা গত চার দশকের মধ্যে ২০২০ সালের মন্দার বাইরে সবচেয়ে বড় পতন।
খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি খাতের চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়, কৃষ্ণসাগরে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংঘাতের কারণে শস্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় ২০২৬ সালে খাদ্য পণ্যের দাম ১০ শতাংশের কিছুটা বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে। এর পর ২০২৭ সালে তা আরও ৭ শতাংশের বেশি বেড়ে গিয়ে যৌথভাবে প্রায় ১৮ শতাংশে পৌঁছাবে। প্রতিবেদনে একটি সম্ভাব্য প্রতিকূল পরিস্থিতির উল্লেখ করে সতর্ক করা হয়েছে যে, রেকর্ড পরিমাণ এল নিনোর প্রভাব, কৃষ্ণসাগরে শস্য সরবরাহে বাধা, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রসার এবং রাশিয়ার তেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা যদি একই সঙ্গে ঘটে, তবে খাদ্যদ্রব্যের দাম প্রত্যাশার চেয়ে আরও ১২ শতাংশ বেশি বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকের মতোই মারাত্মক খাদ্য সংকট তৈরি হতে পারে, যা অতিরিক্ত ৪ কোটিরও বেশি মানুষকে চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। একই সঙ্গে ইউরিয়ার দাম বৃদ্ধির কারণে ২০২৬ সালে সারের দাম ১৪ শতাংশ বাড়বে, যা ২০২৭ সালে গিয়ে ২০২৫ সালের স্তরে ফিরতে পারে।
শিল্প খাত ও নিরাপদ বিনিয়োগের বাজারেও উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৬ সালে ধাতুর সার্বিক দাম ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে নতুন রেকর্ড গড়তে পারে। নবায়নযোগ্য শক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) এবং ডেটা সেন্টারে শক্তিশালী চাহিদার পাশাপাশি সরবরাহ ঘাটতির ফলে অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চে পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনা ও মূল্যবান ধাতুর চাহিদা লাফিয়ে বেড়েছে, যার ফলে ২০২৬ সালে মূল্যবান ধাতুর দাম ৪০ শতাংশ পর্যন্ত লাফিয়ে বাড়তে পারে, যদিও ২০২৭ সালে এতে কিছুটা শিথিলতা আসতে পারে।
বিশ্বের শীর্ষ ২০টি অর্থনীতির দেশগুলোর (জি২০) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আসন্ন বৈঠকের ঠিক দুই দিন আগে বিশ্বব্যাংক তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করল। জর্জিয়ার আটলান্টায় অনুষ্ঠেয় ওই শীর্ষ বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি আলোচনার মূল কেন্দ্রে থাকবে। বিশ্বব্যাংক নিশ্চিত করেছে যে তারা বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র ও ঋণগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা দিতে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ইতিপূর্বে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ক্ষতিকর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ২৫টি দেশকে ৮.৭ বিলিয়ন ডলার নমনীয় ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৯টি দেশ নতুন সহায়তা নিয়েছে এবং ১০টি দেশ সংকট মোকাবিলায় বিদ্যমান কর্মসূচি পুনর্বিন্যাস করেছে।
সূত্র: চ্যানেল নিউজ এশিয়া
ভোরের আকাশ/এনএস