প্রথম দফায় ৯৩ শতাংশ উপস্থিতি
পশ্চিমবঙ্গে রেকর্ড ভোট, কারণ কি এসআইআর?

রেকর্ডসংখ্যক ভোটদান ও ভোটারের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ভোটে প্রায় ৯৩ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় মোট আসনসংখ্যা ২৯৪টি। এবারের নির্বাচনে দুই দফায় ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামী ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় বাকি ৮ জেলার ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের পশ্চিমবঙ্গ শাখার তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দফায় ১৫২টি আসনে ভোট পড়েছে ৯২ দশমিক ৮৮ শতাংশ। জেলার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে কোচবিহারে— ৯৬.০৪ শতাংশ। দক্ষিণ দিনাজপুরে ৯৫.৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। জলপাইগুড়ি, মালদহ, বীরভূম ও উত্তর দিনাজপুরে ৯৪ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। দার্জিলিং ও কালিম্পঙে ভোটের হার ৯০ শতাংশের নিচে থাকলেও বাকি প্রায় সব জেলাতেই ভোটের হার ৯০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
এই ভোটদানের হার শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, ভারতের অন্যান্য রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনেও বিরল বলে মনে করা হচ্ছে। অনেকেই এটিকে নজিরবিহীন ভোটগ্রহণ হিসেবে উল্লেখ করছেন। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার জানিয়েছেন, স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গে এটিই সর্বোচ্চ ভোটদানের রেকর্ড। এ জন্য তিনি রাজ্যের ভোটারদের ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। সূত্র : আনন্দবাজার
ভোটের জোয়ারের পেছনে কী কারণ
বিশ্লেষকদের মতে, এই নজিরবিহীন ভোটদানের অন্যতম কারণ হতে পারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। প্রথম দফায় যে ১৫২টি আসনে ভোট হয়েছে, সেখানে প্রায় ৪০ লাখের বেশি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। ফলে মোট ভোটারের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভোটের হার বৃদ্ধি পাওয়াটা স্বাভাবিক।
তবে শুধু হার নয়, ভোটদাতার সংখ্যাও বেড়েছে আগের নির্বাচনের তুলনায়। এর পেছনে একটি বড় কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে— ভোট না দিলে তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা। এই ভয়ে অনেকেই দূরদূরান্ত থেকে কাজ ফেলে ভোট দিতে এসেছেন। তবে এই বিপুল ভোট কার পক্ষে গেছে— শাসক না বিরোধী— তা এখনো স্পষ্ট নয়। আগামী ৪ মে ফলাফল ঘোষণার পরই এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি-পাল্টা দাবি
প্রথম দফার ভোটের পর শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস ও বিরোধী দল বিজেপি— উভয়েই নিজেদের পক্ষে ফল আসবে বলে দাবি করেছে। দুই দলই বলছে, প্রথম দফার ১৫২টি আসনের মধ্যে তারা ১২৫টির বেশি আসনে জয় পাবে।
তৃণমূলের দাবি, এসআইআর নিয়ে মানুষের অসন্তোষই বেশি ভোটদানের কারণ এবং এর প্রভাব তাদের পক্ষে যাবে। অন্যদিকে বিজেপির মতে, এই বিপুল ভোট রাজ্যে পরিবর্তনের পক্ষে জনসমর্থনের ইঙ্গিত।
ভোটের পরিসংখ্যান ও পরিবর্তন
২০২১ সালের নির্বাচনে এই ১৫২টি আসনে মোট ভোটার ছিল প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ এবং ভোট পড়েছিল ৮৩.২ শতাংশ। সে সময় ভোট দিয়েছিলেন প্রায় ৩.১৪ কোটি মানুষ।
অন্যদিকে ২০২৬ সালে এসআইআর-এর পর ভোটারের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ। কিন্তু ভোট দিয়েছেন প্রায় ৩ কোটি ২৪ লাখ মানুষ। অর্থাৎ ভোটার কমলেও ভোটদাতার সংখ্যা বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখার তাগিদেই অনেকেই ভোট দিতে আগ্রহী হয়েছেন। গত কয়েক দিনে হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশনে অন্য রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকদের ভিড়ও তারই প্রমাণ। মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলায় বহু পরিযায়ী শ্রমিক শুধুমাত্র ভোট দেওয়ার জন্য ফিরে এসেছেন।
যুক্তি ও পাল্টা যুক্তি
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, বেশি ভোট পড়লে তা সাধারণত ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায়। তবে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। তৃণমূলের নেতারা অতীতের নির্বাচনের উদাহরণ দিয়ে দাবি করছেন, বেশি ভোট পড়লেও ফলাফল তাদের পক্ষে যেতে পারে। অন্যদিকে বিরোধীরা ২০১১ সালের উদাহরণ টানছে, যখন ৮৪.৩৩ শতাংশ ভোট পড়ে এবং দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটে।
এসআইআর ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক
এবারের নির্বাচনে এসআইআর একটি বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিজেপির দাবি, ভোটার তালিকা থেকে অবৈধ নাম বাদ দিয়ে নির্বাচনকে আরও স্বচ্ছ করার জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তৃণমূলের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার কারণে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং এর বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়েছে।
বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ
প্রথম দফার ভোট মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ হলেও কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। মুর্শিদাবাদের ডোমকলে সিপিএম ও তৃণমূলের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দক্ষিণ দিনাজপুরের কুমারগঞ্জে বিজেপি প্রার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া বীরভূমের খয়রাশোলে ইভিএম ত্রুটিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং কিছু ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। কয়েকজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য আহত হন।
ভোরের আকাশ/সু.পা