ট্রাম্পের ১০ শতাংশ শুল্কনীতি অবৈধ ঘোষণা করল ফেডারেল আদালত

যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে আবারও ধাক্কা খেল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি। গত বৃহস্পতিবার (৮ মে) দেশটির একটি ফেডারেল আদালত ট্রাম্পের ঘোষিত বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ সাধারণ আমদানি শুল্ককে ‘অবৈধ’ বলে রায় দিয়েছেন। চলতি বছরে তার বাণিজ্য নীতির ওপর এটি দ্বিতীয় বড় ধাক্কা।
নিউইয়র্কভিত্তিক ইউএস কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড (সিআইটি)-এর তিন বিচারকের প্যানেল ২-১ ভোটের ব্যবধানে এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ‘সেকশন ১২২’ ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট যে শুল্ক আরোপ করেছেন, তার পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তি নেই।
আদালতের ব্যাখ্যা ও আইনি বিতর্ক : গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের তথাকথিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কনীতিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। এরপর দ্রুত ‘সেকশন ১২২’ নামে একটি পুরোনো আইন ব্যবহার করে ট্রাম্প নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। এই ধারায় বলা আছে, যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের ‘পেমেন্ট ঘাটতি’ দেখা দিলে প্রেসিডেন্ট সাময়িকভাবে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারেন।
তবে আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারক মার্ক বারনেট ও ক্লেয়ার কেলি রায়ে উল্লেখ করেন, প্রশাসন যে ধরনের বাণিজ্যিক ঘাটতিকে ভিত্তি করেছে, তা আইনে বর্ণিত ‘পেমেন্ট ঘাটতি’র সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। তাদের মতে, এটি সাধারণ বাণিজ্য ঘাটতি, যা এই আইনের আওতায় পড়ে না। তারা আরও বলেন, প্রেসিডেন্টের এই পদক্ষেপ ‘আল্ট্রা ভাইরেস’ বা ক্ষমতার অপব্যবহার। তবে বিচারক টিমোথি স্ট্যানসিউ ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন।
কারা পাচ্ছেন এই রায়ের সুবিধা : এই রায় তাৎক্ষণিকভাবে সব আমদানিকারকের জন্য কার্যকর হয়নি। আপাতত শুধুমাত্র মামলার বাদীপক্ষ এই সুবিধা পাবে। এর মধ্যে রয়েছে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্য এবং দুটি ক্ষুদ্র আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান—মশলা আমদানিকারক ‘বারল্যাপ অ্যান্ড ব্যারেল’ এবং খেলনা নির্মাতা ‘বেসিক ফান!’। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, এই তিন পক্ষের কাছ থেকে আর কোনো শুল্ক আদায় করা যাবে না এবং আগে আদায় করা অর্থ সুদসহ ফেরত দিতে হবে। তবে এই রায়ের কোনো দেশব্যাপী প্রয়োগ না থাকায় অন্যান্য আমদানিকারকদের জুলাই পর্যন্ত ১০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে।
ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া : রায়কে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ‘বেসিক ফান!’-এর প্রধান নির্বাহী জে ফোরম্যান বলেন, অবৈধ শুল্কনীতি তাদের মতো কোম্পানির জন্য বিশ্ববাজারে টিকে থাকা কঠিন করে তুলেছিল। এই রায় ব্যবসার স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে। অন্যদিকে ‘বারল্যাপ অ্যান্ড ব্যারেল’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইথান ফ্রিশ বলেন, এটি ন্যায্য ও পূর্বানুমেয় বাণিজ্য নীতির পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজয়।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ও পরবর্তী পদক্ষেপ : রায়ের পরও হতাশ হননি ট্রাম্প। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আদালতের রায় তাকে অবাক করে না। তার মতে, “দুইজন কট্টর বিচারক বিপক্ষে গেছেন, একজন পক্ষে।” হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, এই রায়ের বিরুদ্ধে দ্রুত আপিল করা হবে।
১৬৬ বিলিয়ন ডলার ফেরত ও নতুন শুল্কের ইঙ্গিত : এর আগে সুপ্রিম কোর্ট ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (IEEPA) অনুযায়ী ট্রাম্পের কিছু শুল্ক বাতিল করেন। এরপর প্রশাসন প্রায় ১৬৬ বিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ‘সেকশন ৩০১’ ব্যবহার করে নতুন করে শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে। এর লক্ষ্য চীন ও মেক্সিকোর মতো দেশের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করা।
বাজারে অনিশ্চয়তা : এই রায় ও পাল্টা রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে মার্কিন বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পণ্যের দাম ওঠানামা করছে এবং ভোক্তারা প্রভাবিত হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই আইনি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই রায় ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতিকে সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত করলেও আইনি লড়াই এখনও শেষ হয়নি। আগামী দিনগুলোতে এই শুল্কনীতি নতুন করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে। সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন, পলিটিকো, টাইম
ভোরের আকাশ/সু.পা