‘ন্যাটো ৩.০’ নিয়ে চীনের সতর্কবার্তা

উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোট (ন্যাটো) আরও বেশি ইউরোপকেন্দ্রিক নেতৃত্বের দিকে এগোচ্ছে। তবে এই পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে বিদ্যমান কৌশলগত মতপার্থক্য দূর করতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছে চীনের একটি প্রভাবশালী গবেষণা প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ন্যাটোর ক্রমবর্ধমান তৎপরতা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও সতর্ক করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বুধবার (১৫ জুলাই) হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের খবরে বলা হয়, চীনের রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান চায়না ইনস্টিটিউটস অব কনটেম্পোরারি ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স (সিআইসিআইআর) গত সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব মন্তব্য করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানসহ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়তে থাকলে জোটটি দ্রুত পরিবর্তনশীল বহুমেরুকেন্দ্রিক (মাল্টিপোলার) বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে আরও বেশি সাংঘর্ষিক অবস্থানে পড়বে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে গত সপ্তাহে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনের পর। ওই সম্মেলনে জোটের ভবিষ্যৎ কৌশলগত দিকনির্দেশনার অংশ হিসেবে আলোচনায় আসে তথাকথিত ‘ন্যাটো ৩.০’ ধারণা।
সিআইসিআইআরের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ন্যাটো ৩.০’ বলতে এমন একটি কাঠামোকে বোঝানো হচ্ছে, যেখানে ইউরোপ নিজেদের প্রচলিত প্রতিরক্ষার বড় দায়িত্ব নেবে এবং যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক নিরাপত্তা অঙ্গীকার নতুনভাবে পুনর্বিন্যাস করবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ন্যাটোর এই রূপান্তরের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘বার্ডেন শেয়ারিং’ বা প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বোঝা ভাগাভাগির নীতি। ২০২৫ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলেও ইউরোপীয় মিত্রদের নিজস্ব প্রতিরক্ষার প্রধান দায়িত্ব নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে চীনা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, এই পরিবর্তনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দীর্ঘদিনের স্বার্থগত দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ওয়াশিংটন যেখানে প্রতিরক্ষা ব্যয় কমানো এবং ইউরোপকে মার্কিন অস্ত্রব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রাখাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, সেখানে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ানো এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের ‘মেড বাই ন্যাটো’ উৎপাদন মডেল এবং ইউরোপের ‘বাই ইউরোপিয়ান’ নীতির মধ্যে বিরোধ ভবিষ্যতে জোটের ভেতরে শিল্প ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা আরও বাড়াতে পারে।
এতে আরও বলা হয়, আঙ্কারা শীর্ষ সম্মেলনে প্রকাশ্যে ঐক্যের বার্তা দেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অবস্থান নিয়ে ইউরোপের অস্বস্তি আড়াল করা যায়নি। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড-সংক্রান্ত মন্তব্য এবং ন্যাটো নিয়ে তার সমালোচনাকে এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধিরও সমালোচনা করা হয়েছে। চীনের মতে, উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের বাইরে জোটটির ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তা আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে অস্থিতিশীল করতে পারে।
বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ায় চীনকে মোকাবিলার লক্ষ্যেই ‘ন্যাটোর এশীয় সংস্করণ’ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
২০২২ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়া, জাপান, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়া—এই চার দেশ নিয়ে গঠিত আইপি–৪ ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে নিয়মিত অংশ নিচ্ছে। এবারও ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকে দেশগুলো প্রতিরক্ষা শিল্প, সরবরাহব্যবস্থা, সাইবার নিরাপত্তা ও উন্নত প্রযুক্তিতে সহযোগিতা আরও জোরদারে একমত হয়েছে।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ ছাড়াও চীন, উত্তর কোরিয়া ও ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
চীনা গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির দাবি, উত্তর আটলান্টিকের বাইরে ন্যাটোর শক্তি প্রদর্শন শুধু ইউরোপ নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, ন্যাটোর কাঠামোগত পরিবর্তন হলেও এর মৌলিক চরিত্র বদলায়নি। এটি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব ধরে রাখার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে জোটটি এখনো স্নায়ুযুদ্ধের ‘শূন্য-সমষ্টির’ (জিরো-সাম) মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি বলেও দাবি করেছে সিআইসিআইআর।
ভোরের আকাশ/এম