যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থেকে সামরিক স্বাধীনতা ফেরাতে তৎপর দক্ষিণ কোরিয়া

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর নির্দেশ দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে যুদ্ধকালীন সামরিক নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে লি বলেন, যুদ্ধ শুরু হলে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর ওপর স্বাধীনভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিকল্পিত ‘ওয়ারটাইম অপারেশনাল কন্ট্রোল’ (অপকন) হস্তান্তরের প্রক্রিয়া তার মেয়াদকালেই এগিয়ে নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন কর্মসূচির অগ্রগতিও ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানান তিনি।
লি বলেন, শক্তিশালী জোট নিরাপত্তার ভিত্তিকে আরও দৃঢ় করে। পাশাপাশি নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ালে মিত্র হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার গুরুত্বও বৃদ্ধি পায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোট ও স্বাধীন প্রতিরক্ষা সক্ষমতা একে অপরের পরিপূরক।
১৯৫৩ সালে কোরীয় যুদ্ধ শেষ হলেও দুই কোরিয়ার মধ্যে আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি হয়নি। যুদ্ধের পর থেকেই দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিদেশি সামরিক ঘাঁটি ক্যাম্প হামফ্রিজ অবস্থিত।
যুদ্ধকালীন সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী পরিচালনার ক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে। দুই দেশের যৌথ বাহিনী পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কম্বাইন্ড ফোর্সেস কমান্ডের প্রধান পদটিও ঐতিহাসিকভাবে একজন মার্কিন চার তারকা জেনারেলের অধীনে রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৯৪ সালে শান্তিকালীন সামরিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ফিরিয়ে নিলেও যুদ্ধকালীন নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার দেশটির জাতীয় সার্বভৌমত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে আছে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিষয়টি দেশটির অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা লক্ষ্য হলেও বিভিন্ন সরকারের সময়ে তা বারবার পিছিয়ে গেছে।
এদিকে চলতি সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ শুরু হয়েছে। ১০ দিনব্যাপী এই মহড়ায় প্রায় ১৮ হাজার দক্ষিণ কোরীয় সেনা অংশ নেওয়ার কথা ছিল। জাতিসংঘ কমান্ডের ১৮ সদস্য দেশের মধ্যে ১১টি দেশের সেনা ও সামরিক কর্মীদেরও এতে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে রোববার রাতে ট্রাম্প পেন্টাগনকে মহড়ার পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর নির্দেশ দেন। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে ‘হুমকিহীন’ ও ‘সম্মানজনক’ উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, কিমের সঙ্গে তার সম্পর্ক খুব ভালো।
এর পরই দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট সামরিক সক্ষমতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন কর্মসূচির অগ্রগতির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ যুদ্ধে সমন্বিত সামরিক অভিযান পরিচালনায় সক্ষম কর্মকর্তাদের গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পরও দক্ষিণ কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহড়া চলমান রয়েছে। তবে মহড়ার পরিসর কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই দেশের সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে উত্তর কোরিয়ার সেনাদের অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া নতুন যুদ্ধকৌশল মোকাবিলায় এবারের মহড়ায় ড্রোনসহ আধুনিক যুদ্ধের বিভিন্ন দিক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সেনারা ড্রোনসহ নতুন যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, যা পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক সক্ষমতায় পরিবর্তন আনতে পারে।
এদিকে উত্তর কোরিয়া নিয়মিতভাবে এসব মহড়াকে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছে। ওয়াশিংটন ও সিউল অবশ্য বলছে, এসব মহড়ার উদ্দেশ্য উত্তর কোরিয়াকে আক্রমণ করা বা কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা বাড়ানো নয়; বরং দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
ভোরের আকাশ/সু.পা